ঢাকা থেকে এক আইনজীবী নিজে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের পথে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী পার হওয়ার পর হঠাৎ গাড়ি লক্ষ্য করে ছুটে আসে লম্বা এক শাবল; চোখের পলকে তা বিকট শব্দে পেছনের দরজার নিচে আঘাত করে। হচকচিয়ে যান তিনি। গাড়ির গতি কমিয়ে থামানোর চেষ্টা করতেই পাশে থাকা স্ত্রী চিৎকার করে বলেন, “থামিও না, ডাকাত- জোরে চালাও।”
হঠাৎ শব্দে গাড়িতে থাকা তাদের দুই শিশু সন্তানও জেগে গিয়ে চিৎকার করতে থাকে। তৈরি হয় আতঙ্ক আর ভীতির এক মুহূর্ত। আশপাশে অন্ধকার থাকায় গাড়িও থামাতে পারছিলেন না।
মিনিট দশেক পর মহাসড়কের পাশে লোকজন দেখে একটি স্থানে গাড়ি থামান। দেখতে পান শাবলের আঘাতে গাড়ির পেছনের অংশ কেটে দেবে গেছে। বুঝতে পারেন ডাকাত বা লুটেরাদের লক্ষ্য ছিল গাড়ির চাকা। ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতির গাড়ির চাকায় তা আঘাত করলে কী ঘটতে পারত ভাবতেই গা শিউরে ওঠে ওই আইনজীবীর।
তার স্ত্রী গাড়িতে আঘাতের শব্দের পরপরই চোখের এক কোণে সড়কের পাশ থেকে অন্ধকার ফুড়ে কয়েকজনকে এগিয়ে আসতে দেখে তাকে গাড়ি থামাতে নিষেধ করেছিলেন। তা না হলে কী যে হত- আর ভাবতেও চান না তিনি।
শুধু এই একটি ঘটনাই নয়। বরং একের পর এক ‘দুর্ধর্ষ’ কায়দায় ডাকাতির কারণে রীতিমত ‘আতঙ্কে’ পরিণত হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। অস্ত্রধারী ডাকাতদের কবলে অর্থ আর মালামাল খোয়াচ্ছেন অনেকে, যাদের মধ্যে বড় অংশ প্রবাস ফেরত ব্যক্তিরা। মাইক্রোবাসের পাশাপাশি সেডান কারের মত ছোট গাড়ি থাকে তাদের নিশানায়।
মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রী ও চালকদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা শুধু আর্থিক নয়, ডাকাত-বা ছিনতাইকারীর মারধরের শিকার হয়ে শারীরিকভাবেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে টানা ঘটতে থাকা এসব ডাকাতি ও লুটের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারায় হাইওয়ে পুলিশের একজন ওসিকে প্রত্যাহার করে নেওয়াও প্রমাণ করে, পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক হয়ে উঠেছে এ পথের যাত্রীদের জন্য।
কুমিল্লার মানুষের ভাষ্য, রাতে এ পথে ডাকাত; আর দিনে শহরের রাস্তাঘাটে ‘মলম’ বা ‘অজ্ঞান পার্টির’ দৌড়াত্ম। দুইয়ে মিলে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ।
এ ধরনের অপরাধ দমনে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’, যৌথবাহিনীর অভিযান চললেও লুটপাট থামছে না। এমন প্রেক্ষাপটে বুধবারও সড়কে আলাদা করে প্রায় ২৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম, কুমিল্লা সিলেট ও কুমিল্লা নোয়াখালী অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করবেন। হাইওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোঃ খাইরুল আলম বলেন, অন্তত আগামী এক মাসের জন্য মহাসড়কের নিরাপত্তা জোরদার করতে কাজ করবেন তারা। বিশেষত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রাধান্য দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে।
একের পর এক ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা বাড়তে থাকা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আগে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও ৫ অগাস্টের পর তা বাড়ছে। বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী, রাজধানীতে আসা ব্যবসায়ী, গাড়িচালক, মোটরসাইকেল আরোহী ও স্থানীয় তৈরি পোশাক শ্রমিকরা বেশি ডাকাতি, ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।
আর দিনের বেলায় শহরে নানা ধরনের চেতনানাশক ওষুধ ব্যবহার করে টাকা-পয়সা স্বর্ণালংকার কেড়ে নিচ্ছে অজ্ঞান পার্টি।
পরপর ডাকাতির ঘটনায় মাহাসড়কে টহল বাড়িয়েছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী।
ডাকাতদের তথ্য দেয় ‘হকাররা’
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মুন্সীগঞ্জের ভবেরচর, কুমিল্লার দাউদকান্দি এবং চৌদ্দগ্রাম এলাকায় গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১০ থেকে ১২টি ডাকাতির ঘটনার খবর দিয়েছেন পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা।
এ পথে চলাচলকারী গাড়ির চালকরা বলছেন, ডাকাতদের অন্যতম লক্ষ্য ‘প্রবাসীরা’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুয়া পরিচয়েও ডাকাতি করা হচ্ছে মহাসড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায়। এছাড়া বিভিন্ন টোল প্লাজার হকাররা এবং হাইওয়ের বিভিন্ন হোটেলগুলো থেকে তথ্য দিয়েও ডাকাতদের সহযোগিতা করে।
১ মার্চ ভোর সাড়ে ৬টার দিকে চৌদ্দগ্রাম থানা থেকে ৫০০ মিটার দূরে মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের ফাল্গুনকরা এলাকায় বেলাল হোসেন নামে মালয়েশিয়া প্রবাসীর সবকিছু লুট করে ডাকাতদল।
ফেনীর দাগনভূঁইয়া উপজেলার শরিফপুর গ্রামের এ বাসিন্দা বলছিলেন, “একদল ডাকাত পিকআপ ভ্যান দিয়ে আমাদের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে সড়কের বাইরে ফেলে দেয়। পরে দেশি অস্ত্রশস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল ফোন, সোনা ও নগদ টাকাসহ আমার সর্বস্ব লুট করে।
“কষ্ট করে টাকা-পয়সা রোজগার করে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলাম, পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটানোর জন্য। ডাকাতরা আমার পরিবারের জন্য আনা বিভিন্ন উপহারের তিনটি লাগেজ, মোবাইল ফোন, নগদ বিদেশি মুদ্রা সব নিয়ে গেছে।”
বেলাল হোসেনকে বহনকারী মাইক্রেবাসের মালিক সাগর মিয়া বলেন, “প্রবাসীদের গাড়িগুলোকে মূলত টার্গেট করা হয়, বিভিন্ন টোল প্লাজায় পানি, শসা, চানাচুর, বড়ই বিক্রেতা হকারদের মাধ্যমে। এছাড়া হাইওয়ের পাশের কোনো হোটেল থেকেও সোর্সরা ডাকাতদের গাড়ির মালামাল ও মানুষ সম্পর্কে তথ্য দেয়। ডাকাতরা বেশির ভাগই এখন পিকআপ ভ্যান এবং কভার্ড ভ্যান ব্যবহার করছে। যেন তারা দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে।”
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়ন। হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খাইরুল আলম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহাসড়কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় হাইওয়ে পুলিশ নিরলস কাজ করছে। বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।


