বাংলাদেশের কৃষি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ার মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের লাভজনকতা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। সেই প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে মালচিং বর্তমানে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সম্ভাবনাময় কৃষি প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মালচিং হলো জমির ওপর বিশেষ ধরনের পলিথিন ফিল্ম বা জৈব আবরণ ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনের একটি আধুনিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়, আগাছা কমে, মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সেচের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। বর্তমানে তরমুজ, টমেটো, মরিচ, বেগুন, স্ট্রবেরি, ফুলসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল চাষে দেশে মালচিং প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও গবেষণায় দেখা গেছে, মালচিং ব্যবহারে ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত পানি সাশ্রয় হয় এবং আগাছা দমন ব্যয় ৭০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ফলন ১৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদন খরচ ২০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। উদাহরণস্বরূপ, এক বিঘা জমিতে মালচিং ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ ব্যয়ে প্রায় ২ থেকে ২.৫ হাজার টাকা সাশ্রয় করতে পারেন এবং অতিরিক্ত ফলনের মাধ্যমে আরও বেশি আয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।
তবে এই সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বিস্তারে বর্তমানে অন্যতম প্রধান বাধা হলো বিদ্যমান ভ্যাট ও কর কাঠামো। বর্তমানে মালচিং পেপারের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত রয়েছে, যার ফলে কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে মালচিং ব্যবহারে শুধুমাত্র ভ্যাটের কারণেই কৃষকের ব্যয় অতিরিক্ত ১,৫০০–২,৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানিতেও বিভিন্ন কর ও শুল্ক প্রযোজ্য হওয়ায় দেশীয় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মালচিং কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদন সহায়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অনেক কৃষি যন্ত্রপাতি ও কৃষি উপকরণের মতো মালচিং পেপারকেও কৃষি উপকরণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর ওপর আরোপিত ভ্যাট ও কর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়বে এবং দেশীয় উৎপাদন শিল্পও বিকশিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মালচিং প্রযুক্তির প্রসারে নীতিগত সহায়তা ও ভ্যাট সুবিধা প্রদান করা হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশে এর ব্যবহার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে এটি কৃষকের লাভজনকতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, পানি সাশ্রয়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দেশীয় শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তাই কৃষকের স্বার্থ, টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে মালচিং পেপারের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ও কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার এখনই উপযুক্ত সময়।


