Friday, July 17, 2026
Home পুঁজিবাজার ভালো রিটার্ন সত্ত্বেও বন্ধ হয়ে যেতে পারে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড, বিএসইসির ...

ভালো রিটার্ন সত্ত্বেও বন্ধ হয়ে যেতে পারে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড, বিএসইসির সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। লেনদেন যেখানে দুই মাস আগেও ছিল ১,৫০০ কোটি টাকা, সেখানে তা আজ নেমে এসেছে মাত্র ২০০ কোটিতে। হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা, অনেকে কার্যত নিঃস্ব। বাজারের এই ধস কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি সরাসরি এসেছে পুঁজিবাজারবিরোধী দুই বিধিমালা: মার্জিন রুলস এবং মিউচুয়াল ফান্ড রুলস ২০২৫ থেকে এমনটাই ভাবছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব নীতির আড়ালে চলছে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড বন্ধ করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বিশ্ব বাজারের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ ভীষণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের ফলে এই খাতটি বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। বিগত ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সময়ে কিছু অনৈতিক বিধিমালা প্রবর্তনের কারনে এ খাতটিতে যে ধ্বস নেমে এসেছিলো তা এখনো বিদ্যমান। কেননা সেই দোসরদের কার্যক্রম এখনো চলমান। এক্ষেত্রে সরকার এবং উপর মহলের পক্ষ থেকে সুদৃষ্টি প্রয়োজন। গত দুই দশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা, নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন এবং বিনিয়োগ বৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি ছিল মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড। ২০০৮ সালে এই সেক্টরের আকার ছিলো ২০০০ কোটি টাকা যা এখন বেড়ে ১০,০০০ কোটি হয়েছে। আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে বিনিয়োগকারীরা এর সুফল ভোগ করতে শুরু করে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো বিগত ৫ বছরে বিনিয়োগকারীদের ১৩৫ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে, যা এই মন্দা বাজারে উল্লেখযোগ্য। মেয়াদী ফান্ডগুলো থেকে বছরের পর বছর ডিভিডেন্ড পেয়ে আসছে বিনিয়োগকারীরা।

রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৫ বছরের মেয়াদী ফান্ডগুলোর ক্যাশ ডিভিডেন্ড এর চিত্রঃ

২০১৯-২০২৪ পরযন্ত এইমস ১২ কোটি৭৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা, এশিয়ান টাইগার ১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা সিএপিএম ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, আইসিবি এএমসিএল ১৮ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার টাকা, এলআরগ্লোবাল ২৩ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, রেইস ৬১ কোটি ২১ লাখ ৬ ০ হাজার, এসইএমএল ৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮ ০ হাজার, ভ্যানগার্ড ৩ কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার, ভিআইপিবি ৩ কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ফান্গুলো গত ৫ বছরে সর্বমোট ১৩৫ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকার লভ্যাংশ দিয়েছে।

বাজার ভারসাম্য রক্ষায় ক্লোজড এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডঃ দীর্ঘ মেয়াদে পুজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের কান্ডারি ক্লোজড এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ক্লোজড এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মার্কেট এক্সপোজারঃ সম্পদ ব্যবস্থাপক এক্সপোজার ভ্যানগার্ড ৭৯.৯%, এল আর গ্লোবাল ৬৮.৪%, রেইস ৭২.৪%, এইমস  ৭৫.১%, আইসিবি এএমসিএল ৯৭.৩%, ক্যাপিটেক ৮২.৮%।

সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য মতে, তাদের অধিকাংশ সম্পদই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা। যা পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছে।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস-এর সিনিয়র অ্যাডভাইজর (রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) ড. একেএম মাজহারুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করেন যে, ”২০ বছরে গড়ে ওঠা ১০,০০০ কোটি টাকার একটি সেক্টরকে এক ঝটকায় নিশ্চিহ্ন করা কোনো অর্জন নয় এবং এটি পুঁজিবাজারের জন্য কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল আনবে না।

তাঁর মতে, ক্লোজ-এন্ড ফান্ডগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া এমনিতেই দুর্বল ও অপ্রতুল মূলধন বাজারে ব্যাপক বিক্রয় চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ মূলধন পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সেক্টর গড়ে উঠতে লম্বা সময় লেগেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত লাখো বিনিয়োগকারী ও হাজারো পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।

এমতাবস্থায় অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা বোঝা মুশকিল। এটি বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নজীরবিহীন এবং বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসেও এমন পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

“ ড. মাজহার আরো বলেন, “এ বিষয়ে তাদের অবস্থান বিএসইসিকে জানানো হয়েছে। তবে কমিশন শুধু এই আইনটিকে “দ্রুত বাস্তবায়ন” করতে আগ্রহী। অংশীজনের মতামত বা এ ধরনের সিদ্ধান্তের আইনগত যৌক্তিকতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রতি তাদের আগ্রহ খুবই সীমিত।”

বাংলাদেশে মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড বহু বছর ধরে কার্যকর, পরীক্ষিত এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ কাঠামো। আন্তর্জাতিক বাজার যেখানে এই খাতকে শক্তিশালী করছে, সেখানে বাংলাদেশে এর বিপরীত পথে হাঁটা নিঃসন্দেহে বাজারকে অস্থিতিশীল করার বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। মেয়াদী ফান্ড বাজারের গভীরতা বাড়ায়, অর্থনীতিকে গতিশীল করে। তাই বিলুপ্তি নয় – সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের একমাত্র লক্ষ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে ধসের কিনারায় দাঁড়িয়ে—মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ড বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত তাকে আরও তলিয়ে দেবে এমনটাই মনে করছে বাজার সংশ্লিষ্টরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সড়কে বর্জ্য ফেলার ঘটনায় ৩ পরিচ্ছন্নতাকর্মী বরখাস্ত

ঢাকার আমিনবাজার-হেমায়েতপুর মহাসড়কের পাশে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বর্জ্য ফেলতে গিয়ে তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের...

ত্রাণ বিতরণের সময় মঞ্চ ভেঙে পড়লেন অর্থমন্ত্রী

চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত মানুষের চাপে মঞ্চের একটি অংশ ধসে পড়ে। এ সময় মঞ্চে থাকা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির...

বন্যাদুর্গত ৫ জেলার কৃষকদের বীজ ও ধানচারা দেবে সরকার

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলার কৃষকদের পুনর্বাসনে ধানের বীজ ও চারা সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।...

ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে জুলাইকে ব্যবহার করতে দেব না’: মির্জা ফখরুল

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের চেতনা কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হতে পারে না। তিনি...

Recent Comments