মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। সংগঠনটির মতে, শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতেই বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিকের জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এরই মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু প্রবাসী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ থেকে জানা গেছে, বর্তমানে উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে বিদেশগামী মোট শ্রমিকের প্রায় ৮২ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে যান। ফলে এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রামরুর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। বক্তারা বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে।
রামরু জানায়, যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বহুল আলোচিত ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নিওম সিটি, রেড সি টুরিজম ডেভেলপমেন্ট ও কিদ্দিয়া এন্টারটেইনমেন্ট সিটির মতো মেগা প্রকল্পগুলোয় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেলে কিংবা অবকাঠামোগত ক্ষতি হলে এসব প্রকল্পে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কর্মীদের সহায়তার জন্য জাতীয় বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এ ধরনের সংকটে দ্রুত সাড়া দিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি বিশেষ তহবিল গঠন জরুরি।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে অনেক বাংলাদেশী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আনুমানিক প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক আটকে থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও প্রকৃত সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। কারণ অনেক নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে নতুন কর্মী নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
এ গবেষক আরো বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ব্যবসা অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে তুরস্কের মতো দেশে বিনিয়োগ স্থানান্তরের প্রবণতা বাড়ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবেলা নয়, দীর্ঘ মেয়াদে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর না দিলে বাংলাদেশের অভিবাসন খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক সংকট মোকাবেলায় দ্রুত দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য জরুরি সহায়তা এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভিত্তিক ড্যাশবোর্ড তৈরির আহ্বান জানান বক্তারা। একই সঙ্গে দেশে ফেরা শ্রমিকদের পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষ আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতের তাগিদ দেন তারা। বক্তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর বাংলাদেশের বৃহৎ রেমিট্যান্স খাতও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


