Friday, May 1, 2026
Home জাতীয় কারফিউ, পথে পথে কাঁটাতারের বেড়া, ৫ই অগাস্ট ঢাকার সকাল কেমন ছিল?

কারফিউ, পথে পথে কাঁটাতারের বেড়া, ৫ই অগাস্ট ঢাকার সকাল কেমন ছিল?

একদিকে সরকার ঘোষিত কারফিউ, অন্যদিকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। এমন এক পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের সকাল থেকেই একেবারে থমথমে অবস্থা ছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়।

সেদিন সকাল থেকেই ক্ষণে ক্ষণে বদলেছে রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি। কোথাও সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া অবস্থান, কোথাও কারফিউ আর বাঁধা ডিঙিয়ে ছাত্র জনতার এগিয়ে যাওয়া। ওইদিন খুব সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি বিবিসি বাংলার সংবাদকর্মীরা মাঠে থেকে তা তুলে ধরেছিলেন।

সকাল থেকেই ঢাকার মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, রামপুরাসহ ঢাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কাঁটাতার দিয়ে ব্যারিকেড বসিয়ে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আগে থেকে যাদের কাছে কারফিউ পাশ ছিল, তারাও ওইদিন সকাল ঢাকার রাস্তায় বের হয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়েন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর জেরার মুখে।

তবে সবচেয়ে বেশি কড়া পাহারা বসানো হয়েছিল ঢাকার প্রবেশমুখগুলােতে, বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, আর আব্দুল্লাহপুরের মতো এলাকাগুলোতে। বিভিন্ন আবাসিক এলাকার গলির মুখেও বসানো হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারা। মাইকিং করে কাউকে ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধও জানাতে দেখা গিয়েছিল পুলিশকে। তবে, বেলা গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।

কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায় ছাত্র জনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষকে। ক্রমেই বদলে যেতে শুরু করে ঢাকার পরিস্থিতি। রাস্তায় নামতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। এমন পরিস্থিতিরি মধ্যে সকাল ১১টার দিকে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ হয়ে যায়।

কাঁটাতারের ব্যারিকেড, থমথমে সকাল কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা ৩৩ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর তেসরা অগাস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় মিনার থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

তাদের ঘোষণা ছিল পাঁচই অগাস্ট সোমবার সারাদেশে বিক্ষোভ ও গণঅবস্থান এবং মঙ্গলবার ছয়ই অগাস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করবেন তারা। তবে, হঠাৎই চৌঠা অগাস্ট বিকেলে এক বিবৃতিতে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এক বিবৃতিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছয়ই অগাস্টের পরিবর্তে পাঁচই অগাস্ট করার ঘোষণা দেন।

এতে সারাদেশের মানুষকে অংশ নেয়ারও আহবান জানানো হয়। ছাত্রদের ঘোষণার পরই চৌঠা অগাস্ট সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ ঘোষণা করে সরকার। ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে রোববার রাত থেকেই ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয় নিরাপত্তা চেকপোস্ট। প্রবেশমূখ তো আছেই, সেই সাথে গণভবন, বঙ্গভবন, শাহবাগ, মহাখালী, উত্তরা, গুলশান, রামপুরা, বনানীর বিভিন্ন রাস্তায় কাঁটাতারের বেষ্টনী বসানো হয়।  সবচেয়ে বেশি কাঁটাতারের বেষ্টনী বসানো হয়েছিল বিজয় স্মরণী, ফার্মগেট, শাহবাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশপাশের এলাকা।

যে কারণে ঢাকার রাস্তায় পাঁচই অগাস্ট ভোর থেকে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধই ছিল। পুরো শহর জুড়ে কিছু অ্যাম্বুলেন্স ও গণমাধ্যমের কিছু গাড়ি দেখা গেছে। সংবাদ সংগ্রহে কারফিউ পাশ নিয়ে সকাল সাড়ে আটটায় রামপুরা ব্রিজের ওপর গেলে সেখানে বিবিসি বাংলার গাড়ি থামান সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

ঠিক ২০০ গজ সামনে বনশ্রী রাস্তায় সেনাবাহিনীর কাঁটাতারের আরো একটি চেকপোস্টেও একই ভাবে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এমন তিন দফা চেকপোস্ট পেরিয়ে সকাল পৌনে নয়টার দিকে যখন বনশ্রী ই-ব্লকের দিকে গিয়ে দেখা যায় প্রধান গলি থেকেই ভেতরে গুলি ছুড়ছিল পুলিশ।

বাংলাদেশের জুলাই-অগাস্টের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বা ওএইচসিএইচআর যে তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “‘মার্চ অন ঢাকা’ থামাতে, বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছাতে বাধা দিতে তখনো পুলিশ অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি চালাচ্ছিল।”

উত্তরা থেকে গনভবন অভিমুখে মিছিল

সকাল ১০টার পর থেকেই পরিস্থিতি একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করে। কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নামতে শুরু করেন তরুণ বয়েসীরা, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছিল ঢাকার উত্তরা। ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ১১টা। উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা।

উত্তরা থেকে বিমানবন্দরে প্রধান সড়কে কয়েক স্তরে রাস্তার ওপর কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসিয়ে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী। বিএনএস ভবনের পাশের গলি দিয়ে ১১টার দিকে মূল রাস্তায় উঠে আসেন বিক্ষোভকারীরা। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন উত্তরার বিএনএস সেন্টার এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে গণভবন অভিমুখে যাত্রা শুরু করে ছাত্র জনতা। আশপাশের বিভিন্ন গলি দিয়ে প্রধান সড়কে আসতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা।

কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে ছোট লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তখন মিছিলটিকে সামনের দিকে না আগাতে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন মাইকে। কিন্তু ছাত্ররা সামরিক বাহিনীর নির্দেশ উপেক্ষা করেই একটু একটু করে মিছিল নিয়ে সামনে আসতে শুরু করে।

মিছিলটিকে থামাতে এক পর্যায়ে ফাঁকা গুলি শুরু করে সেনাবাহিনী। তখন মিছিলের সামনের অংশ রাস্তার ওপর বসে অবস্থান নেয়। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আবারো মিছিলটি সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে মিছিলটি যাত্রা শুরু করে গণভবন অভিমুখে।

দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে উত্তরা এলাকায় বিবিসি বাংলার সংবাদদাতারা দেখতে পান লাঠিসোটা হাতে ছাত্র-জনতার মিছিল একের পর এক সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছিল সামনে। উত্তরা থেকে গনভবনমুখী দীর্ঘ সেই মিছিলে পথে পথে ছাত্রদের সাথে যোগ দেয় মায়েরা, বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ। অনেক গৃহবধূ বা মায়েরা নেমেছিলেন লাঠি হাতে। শ্লোগান তুলেছিলেন ‘দফা এক-দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’।

বিবিসি বাংলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

আগামীকাল সিলেট যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: গ্যাস, সড়ক ও বিমানবন্দরে উন্নয়নের প্রত্যাশা

প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল শনিবার (২ মে) আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সিলেট সফর। প্রধানমন্ত্রীর...

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সরকার কি বাতিল করবে?

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র-এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার...

আজ মহান মে দিবস: শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক দিন

মহান মে দিবস আজ। ঐতিহাসিক মহান মে দিবস ২০২৬, রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করছে বাংলাদেশ। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। মে দিবস...

দুপুরের মধ্যে ঢাকাসহ ১৭ জেলায় ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা

ঢাকাসহ দেশের ১৭ জেলায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। একইসঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিরও আশঙ্কা রয়েছে। আজ শুক্রবার (১ মে) দুপুর...

Recent Comments