প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল শনিবার (২ মে) আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সিলেট সফর। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে পুণ্যভূমি সিলেটে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সাজসাজ রব চারদিকে। প্রশাসন ও বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। তবে এই আনন্দের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসছে সিলেটের একগুচ্ছ অপূর্ণ দাবি ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা।
তথ্য অনুসারে, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সুরমা নদীতীরে ওয়াকওয়ে ও স্লুইস গেট এবং শহিদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত বাসিয়া নদী (খাল) পুনঃখনন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শনিবার সকাল ১০টায় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এরপর তিনি হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। পরে নগরীর চাঁদনীঘাট এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশনের ‘জলাবদ্ধতা নিরসন’ প্রকল্পের উদ্বোধনসহ একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
সরকারপ্রধানের সফরকে কেন্দ্র করে সিলেটে নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। এসএসএফ, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত সমন্বয় সভা করছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও টহল বাড়ানো হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরের প্রধান সড়কগুলো মেরামত, আইল্যান্ডে নতুন রংকরণ এবং আলোকসজ্জা করা হয়েছে। বিশেষ করে সার্কিট হাউস এবং এর আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি নিয়মিত প্রস্তুতি সভা ও লিফলেট বিতরণ করছে। বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে তোরণ, লাগানো হয়েছে ব্যানার-ফেস্টুন।
সরকারি সফর হলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন রয়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে। একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। সফরসূচির অন্যতম আকর্ষণ সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন। জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে এই ইভেন্টের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে সিলেটবাসী বেশ কয়েকটি দাবি বাস্তবায়নের আশা করছেন। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি, ঢাকা-সিলেট ছয় লেন মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করা। এ ছাড়া সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে আধুনিক ও দ্রুতগতির ট্রেন সার্ভিস চালুর দাবিও জোরালো। সিলেটে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প-কারখানা ধুঁকছে। স্থানীয়দের দাবি, সিলেটের গ্যাস সিলেটে আগে নিশ্চিত করে এখানে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) ও হাই-টেক পার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল ও বন্যার হাত থেকে সিলেট নগরী ও হাওর অঞ্চলকে বাঁচাতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তলদেশ খনন (ড্রেজিং) এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি এখন অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে। সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নির্মাণ এবং কৃষি ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার দাবিও প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনতে চান স্থানীয়রা।
সিলেটের প্রবাসীদের বড় দাবি হলো, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে (বিশেষ করে লন্ডন, ম্যানচেস্টার, নিউইয়র্ক ও মধ্যপ্রাচ্য) সরাসরি ফ্লাইট চালু করা। বিমানবন্দরটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ‘ট্রানজিট হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা চান প্রবাসীরা। এ ছাড়া বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধ করা এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিশেষ কোটা বা সুযোগ-সুবিধার দাবিও আলোচনায় রয়েছে। অন্যদিকে সিলেটে প্রবাসীদের জমি ও সম্পদ দখলের সমস্যা দীর্ঘদিনের। প্রবাসীরা দাবি তুলেছেন, তাদের সম্পদ রক্ষায় একটি বিশেষ ‘সেল’ বা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করা হোক, যাতে তারা আইনি জটিলতা ছাড়াই বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে, প্রবাসীদের জন্য সহজ প্রক্রিয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদান এবং প্রবাস থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা। তারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেবেন।
সিলেটে প্রবাসীদের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে একটি ‘প্রবাসী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের অর্জিত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে। এখানকার বিভিন্ন প্রবাসী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীদের অবদানের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। তাই এই সফরে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনের অপেক্ষায় আছে পুণ্যভূমি সিলেট। তার সফরকে কেন্দ্র করে দলের এবং সাধারণ মানুষের মাঝে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা অভূতপূর্ব। তাকে বরণ করতে সিলেট প্রস্তুত।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঐতিহাসিক। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম আসছেন। সিলেট তার শ্বশুরবাড়ি। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ এবং ভালোবাসা ভিন্নমাত্রিক। তার সফর ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দল।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমরান আহমেদ চৌধুরী এমপি বলেন, সিলেটের উন্নয়নে বরাবরই বিএনপি আন্তরিক। দেশের অনেক কিছুর শুরু এই সিলেট থেকে। সিলেটবাসী গত নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে বিএনপিকে। প্রধানমন্ত্রী সিলেটকে প্রচ- ভালোবাসেন। নিজের জন্মভূমি থেকে ফেরার পর তিনি সিলেট আসছেন।


