মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ভ্রমণ চাহিদার অনিশ্চয়তার প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশপথে চাপ বেড়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও থাইল্যান্ডগামী একাধিক আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন উড়োজাহাজ সংস্থা।
ইতোমধ্যে ভারতের বড় এয়ারলাইনস যেমন ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া তাদের গ্রীষ্মকালীন ফ্লাইট সূচিতে পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি জ্বালানি খরচ ও যাত্রী চাহিদার ওঠানামার কারণে এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে এয়ারলাইনগুলো।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের (এটিএফ) খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে উড়োজাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক যাত্রী ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করছেন, বিশেষ করে অবকাশযাপনকারী যাত্রীরা।
টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কেএম মোজিবুল হক জানান, ফ্লাইট কমার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে—নিরাপত্তা উদ্বেগ, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় বিধিনিষেধ এবং জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াত করা অনেক যাত্রী বর্তমানে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা আংশিক বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ফ্লাইট সংকট কাটাতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে। এতে এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ভারতীয় হাব যেমন দিল্লি ও মুম্বাই হয়ে যাত্রীদের গন্তব্যে যেতে হচ্ছে, ফলে যাত্রার সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। সরাসরি ফ্লাইট সীমিত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়েছে। গত ২৪ মার্চ ও ৭ এপ্রিল দুই দফায় জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে মাত্র দুই সপ্তাহে জেট ফুয়েলের মূল্য ১৮২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন।
বর্তমানে দেশে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২২৭ টাকা ৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে প্রতি লিটার ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারেও জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউরোপে জেট ফুয়েলের দাম প্রতি টন ১ হাজার ৮৩৮ ডলারে উঠেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৮৩১ ডলার। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য স্বাভাবিক না হলে ইউরোপে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে এয়ারলাইনগুলো পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে ভাড়া বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্লাইট সংখ্যা কমাচ্ছে। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের দাম গড়ে প্রায় ১ হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকার বেশি বেড়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় মাসে ১ হাজার ৬০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শুধু ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৩৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এভিয়েশন খাতে। এতে যাত্রী পরিবহন কমছে এবং ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ভ্রমণ চাহিদাও হ্রাস পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম। ফলে আগামী দিনগুলোতেও সীমিত ফ্লাইট ও উচ্চ ভাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। ভ্রমণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিলম্ব ও অতিরিক্ত খরচ বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাত্রীদের।


