দুই বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা এখন অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার ড্রেজিং খরচের বিপরীতে সরকারের আয় মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিকল্পনার ঘাটতি ও প্রকৃত বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ায় এই প্রকল্প এখন জনগণের অর্থের অপচয়ের দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেলজিয়ামের প্রতিষ্ঠান জান ডি নুলকে দিয়ে ২০২৩ সালে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করানো হয়, যার মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা বাড়িয়ে ১০.৫ মিটার করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ৪০ হাজার ডেডওয়েট টনের মাদার ভ্যাসেল বন্দরে ভেড়ানো। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই পলি জমে সেই গভীরতা নেমে আসে গড়ে ৬.৫ মিটারে। ফলে এখন বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়তে না পারায় আগের মতো লাইটার জাহাজেই পণ্য খালাস করতে হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যয়বহুল ও অকার্যকর হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পায়রার ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি এলাকায় যেখানে পলি জমার হার খুব বেশি। প্রতিবছর প্রায় ৪০ কোটি কিউবিক মিটার পলি জমে এই চ্যানেলে, যা নিয়মিত অপসারণ না করলে বন্দরের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে পড়ে। জার্মানি, বেলজিয়াম ও বাংলাদেশের গবেষকরা ২০১৯ সালের সমীক্ষাতেই এই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে টেকসই অবকাঠামো, পলিমাটি ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বিবেচনা না করায় এই মেগা প্রকল্প এখন লোকসানের খাতায়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নদী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী মনে করেন, বছরে প্রায় ৮-১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে যদি কৃত্রিমভাবে গভীরতা ধরে রাখতে হয়, তবে তা আর টেকসই নয়।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা পায়রা প্রকল্পে লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। তারা প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের তদন্ত দাবি করেছেন।
পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা স্বীকার করেও শিপিং ও ফরওয়ার্ডিং সংস্থাগুলো বলছে, কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাবে। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি খরচও বাড়ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতের জন্য পায়রায় নতুন করে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বোঝাও হয়ে দাঁড়াবে।


