দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭। এর মধ্যে একাডেমিক ৬ হাজার ৩১২টি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি বা চাকরিসংক্রান্ত কোচিং সেন্টার রয়েছে আরো ২৭৫টি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪’-এ উল্লেখ করা হয়েছে এ তথ্য। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা যদিও বলছেন, নিবন্ধনহীন কোচিং সেন্টারের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ। রাজধানীর পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে স্কুল-কলেজের আশপাশে দেখা মিলছে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের। এসব কোচিং সেন্টার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট হলেও নিবন্ধন বা অনুমোদন দেয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—সিটি করপোরেশ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো তদারকি নেই বললেই চলে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯-এর ১১১ নং ধারা, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯-এর ৭৯ নং ধারা এবং স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ৮২ নং ধারায় এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দেয়ার বিধান রয়েছে। এর সুযোগ নিয়েই কোচিং সেন্টারগুলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো নিবন্ধন নিচ্ছে এবং নিজেদের কার্যক্রমকে বৈধ দাবি করছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে, শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক কত হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই।
বিবিএসের জরিপে কোচিং সেন্টারগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে যেসব কোচিং সেন্টার আছে সেগুলোর মধ্যে ৪ হাজার ৩১০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন, ২ হাজার ২৬টি যৌথ মালিকানাধীন, ১১৬টি ট্রাস্টি বোর্ড বা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ১৩৬টি পরিচালিত হচ্ছে বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯ লাখ ১৭ হাজার এবং মোট জনবল ৬৬ হাজার ৭৫৪ জন। তাদের মধ্যে শিক্ষক রয়েছেন ৬১ হাজার ৮১২ জন।
অভিযোগ আছে, কোচিং সেন্টারগুলোর অধিকাংশেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা জড়িত। তাদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা জারি করলেও তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। বরং অনেক শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের চেয়ে কোচিং সেন্টারেই বেশি সময় দেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের কক্ষই ভাড়া দেয়া হচ্ছে কোচিং কার্যক্রমে। বিবিএসের তথ্য বলছে, কোচিং সেন্টারগুলোর মোট জনবলের মধ্যে ২৬ হাজার ৯৭০ জনই পার্টটাইম কর্মজীবী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোচিং সেন্টার থাকা উচিত নাকি বন্ধ করা উচিত তা দীর্ঘ আলোচনা। এখন যে কোচিং সেন্টারগুলো যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে তাতে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বলা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলার সুযোগ নেই। যেকোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার থেকে নিবন্ধন নিতে পারে। যদি এসব প্রতিষ্ঠানকে সহায়তামূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতে হয়, তাহলে নিবন্ধনের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় নেয়া উচিত। নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহির বিধানও থাকা উচিত।’
অভিভাবকরা জানান, বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম মানসম্পন্ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টরের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠানো যেন এখন প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। তবে বেশির ভাগেরই অনুমোদনের নামে কেবল নামমাত্র কাগজপত্র রয়েছে, কিন্তু পাঠদান বা শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের কোনো তদারকি নেই। ফলে প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা, বরং বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। মাসিক ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য খরচের কারণে পড়াশোনার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়ছে চরম আর্থিক চাপে।
দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কোচিং সেন্টার বিস্তারে মূল ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আলী জিন্নাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘একটি ব্যবস্থায় একই কাজের জন্য এমন দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে ঘাটতি থেকে যায়। আবার আমাদের উচ্চশিক্ষার ভর্তি প্রক্রিয়াও এমন যে কোচিং ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ নেই। যদি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হয় তাহলে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন অবস্থায় নিতে হবে যাতে শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে কোনো ঘাটতি না থাকে। এজন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ভর্তি প্রক্রিয়াও এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থী তার আগের শ্রেণীগুলোয় যথাযথ জ্ঞান-দক্ষতা অর্জন করলেই পরবর্তী ধাপে উত্তীর্ণ হতে পারে। এজন্য যেন তাকে আলাদাভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রয়োজন না হয়।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) কিছু কোচিং সেন্টার নিবন্ধিত থাকলেও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত কোচিং সেন্টারগুলো নিবন্ধিত নয় বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেগুলো বৃহৎ পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে সেগুলো সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত। এমন অনেক কোচিং সেন্টার আছে যেগুলো বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে নিজ বাসায় বা ভাড়া বাসায় পরিচালনা করছেন। এগুলো নিবন্ধিত নয়।’
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও নিবন্ধন ছাড়া কোনো কোচিং সেন্টার চালানো যাবে না—এমন আইন কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের অনুমোদনের ধারা সংশোধন করে শিক্ষা খাতের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এর সংগতি আনতে হবে।
স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে কোচিং সেন্টারের নিবন্ধন গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মানের অবনমনে বড় ভূমিকা রাখছে এসব কোচিং সেন্টার। অনেক শিক্ষক ক্লাসে পাঠদানে গুরুত্ব না দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন। ফলে ক্লাসে পাঠদানে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এছাড়া কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষায় বৈষম্য বাড়াচ্ছে। যার যত বেশি অর্থ আছে সে তত এগিয়ে যাচ্ছে। যার অর্থ নেই সে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। কোচিং বাণিজ্যের প্রসার এবং কোচিং সেন্টারগুলোকে এভাবে স্থানীয় সরকারের অধীনে নিবন্ধন প্রদান কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।’ এ বিষয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব রেহানা পারভীনের বন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।


