Monday, May 18, 2026
Home অর্থ-বানিজ্য সংকটে ২০ ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা

সংকটে ২০ ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বছরের পর বছর আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় ঋণ অনুমোদনের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। ক্রমবর্ধমান মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর পর্যাপ্ত মূলধন ছাড়াই দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের মালিক সরকার। সংকট কাটাতে অতীতে এসব ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছিল, যা এসেছে সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে। এরপরও মূলধন সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকগুলো।

তাদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা করা হয়, তাদের তুলনায় দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ডিসেম্বর শেষে নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।

একই সময়ে ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ১২ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

এ ছাড়া বেসরকারি সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা, সিটিজেনস ব্যাংকের ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে মূলধন ঘাটতি কমার প্রধান কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতি। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। যেহেতু ব্যাংকের মূলধন থেকেই প্রভিশন রাখা হয়, তাই প্রভিশনের চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও কিছুটা কমে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “তিন মাসে ক্যাপিটাল শর্টফলে যে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তা মূলত পুনঃতফসিলের প্রভাব। এজন্য একটি কৃত্রিম উন্নতি দেখা যাচ্ছে। মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং শেষ প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্যই বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যেসব ব্যাংক আগেও মূলধন ঘাটতিতে ছিল, সেগুলো এখনো সেই অবস্থায় রয়েছে।”

তিনি বলেন, “কোনো ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকবে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সিআরএআর ১০ শতাংশের নিচে নামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি হচ্ছে না।”

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “এভাবে পুনঃতফসিল করেই কি সারাজীবন চলতে থাকবে? তাহলে গুরুত্বপূর্ণ এই খাত দুর্বলই থেকে যাবে। প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার দিয়ে বলেছিল, যেসব ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকবে তারা কর্মীদের বোনাস দিতে পারবে না। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছে। কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নিতে পারছে না।”

তার মতে, পুনঃতফসিলের চেয়ে ঋণ রাইট-অফ করাই বেশি কার্যকর সমাধান। ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করার নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এর পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে।

প্রথমত, পুনঃতফসিল ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট দুর্বল করে এবং মূলধন ক্ষয় করে। তিনি এটিকে মানুষের শরীরে “ক্রমাগত রক্তক্ষরণের” সঙ্গে তুলনা করেন, যা সময়ের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে ফেলে।

দ্বিতীয়ত, এটি সমাজে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। ঋণ পরিশোধ না করেও যখন ঋণগ্রহীতারা বারবার ছাড় পান, তখন তারা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের বদলে বিলাসী খরচে অর্থ ব্যয় করতে উৎসাহিত হন। যেমন—দামি গাড়ি কেনা বা বিদেশ ভ্রমণ।

তিনি বলেন, “এর ফলে সৎ ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হন, আর ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা আরও উৎসাহ পায়। সামগ্রিকভাবে এটি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা দুর্বল করছে এবং খাতটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সকাল থেকে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

গাছের শাখা-প্রশাখা কর্তন কাজের জন্য আজ সোমবার (১৮ মে) রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে। সম্প্রতি নর্দান...

সংকটে ২০ ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক...

ভুলক্রমে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা অনলাইন পেমেন্ট, সহজেই পাওয়ার উপায়

অনলাইন পেমেন্টের সময় ভুল নম্বরে টাকা চলে গেলে চিন্তার কিছু নেই। দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে 'রিকল রিকোয়েস্ট' বা...

পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফা বেড়েছে ২১ শতাংশ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পূবালী ব্যাংক পিএলসির চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) নিট মুনাফা বেড়েছে ২১ শতাংশ। আলোচ্য প্রান্তিকে ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২২৪ কোটি...

Recent Comments