জাতীয় পার্টি (জাপা) বর্তমানে রাজনৈতিক ইতিহাসের কঠিন সময় পার করছে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা হারালেও, সংসদে প্রতিনিধিত্ব ও বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত টিকে ছিল দলটি। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে দিন দিন আরও সংকটে পড়ছে তারা। বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান যেমন ঝুঁকিতে, তেমনি নেতাদের ওপর ছাত্র সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন মহলের চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জাপা নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে উপস্থিত থাকলেও জাপার কার্যকলাপ জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জাপা এক সময় রংপুর অঞ্চলে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছিল। কিন্তু ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর পর তাদের প্রতি জনগণের আস্থা অনেকটাই কমে গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে বারবার জোটবদ্ধ হয়ে এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকায় দলটি স্বতন্ত্রতা হারিয়েছে বলে অনেকের মত।
জাপার নেতাদের মধ্যে দলের এই ক্রমাগত পতনের বিষয়ে ভিন্ন মতামত দেখা গেছে। জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সমকালকে জানিয়েছেন, রাজনীতিতে চাপ থাকবে এবং এসব পরিস্থিতি রাজনৈতিক ও আইনি উপায়ে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছেন তারা। তবে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী স্বীকার করেছেন, দলটি বর্তমানে চাপে আছে। তবে তিনি এটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন, কারণ এই চাপের মাধ্যমে দলটি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
ভোটের মাঠে জাপার অবস্থা খুবই শোচনীয়। রংপুর ব্যতীত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে দলটি খুব কম ভোট পেয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কমে গেছে, যা তাদের জনপ্রিয়তার ঘাটতির প্রমাণ দেয়। এমনকি, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তারা মাত্র এক দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মহলেও জাপার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করলেও ফলপ্রসূ কিছু অর্জন করতে পারেননি। কিছুদিন আগে জাপা দাবি করেছিল, সরকার তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে চাপ প্রয়োগ করেছিল। তবে দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সংসদে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জাপা দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচন করেছে। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে মতবিরোধ থাকলেও জাপার নেতারা বিশ্বাস করেন, একটি ঐক্যবদ্ধ দল হিসেবে কাজ করলে ভবিষ্যতে তারা আবার জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, জাপার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমন উজ্জ্বল নয়, কারণ দলটি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে, যা জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে। তিনি মনে করেন, দলের ওপর যে সহানুভূতির সম্ভাবনা ছিল, সেটিও হারিয়ে গেছে।
জাপার নেতারা তাদের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও, সমালোচকদের মতে, এ ধরনের অবস্থান থেকে ফিরে আসা সহজ হবে না। দলটি একদিকে জনগণের আস্থা হারিয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।


