Friday, May 1, 2026
Home জাতীয় ঐক্যের বিজয়ে লেখা হয়েছিল ইতিহাস: আজ সেই ৫ আগস্ট

ঐক্যের বিজয়ে লেখা হয়েছিল ইতিহাস: আজ সেই ৫ আগস্ট

আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট। ঠিক এক বছর আগেই আন্দোলনের মাধ্যমে পতন হয় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার। সরকার প্রধানসহ, সংসদ সদস্য, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিবও পালিয়ে যায় আন্দোলনের ব্যাপকতায়। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলের এমন পরাজয় বিরল। ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষের জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ টু পয়েন্ট ও’।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিণত হয় ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনে। সরকারবিহীন এক জাতির দায়িত্ব নেন সেনাপ্রধান। জানান, বিচার হবে সকল হত্যাকাণ্ডের।

কেমন ছিলো সেদিনের ৫ আগস্ট! সকাল থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো রাজধানী ঢাকায়। দুপুর ১১ টার পর বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। দুপুর গড়াতে এই ঢ্ল পরিণত হয় জনসমুদ্রে। শুধু বাংলার ছাত্র আর রাজনীতিবীদেই সীমিত নয়, সমুদ্রের প্রতিটি বিন্দুর মত লং মার্চ টু ঢাকা বাস্তবায়নে যোগ দেন মায়েরা-যারা এতদিন সন্তানের নিরাপত্তার জন্য পথ আগলে রেখেছিলেন, বাবারা-যারা শাসন করে সন্তানকে ঘরে ফিরতে বলেছিলেন, শহীদদের পরিবার, আত্মীয়, পরিচিত এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ। ছিলেন নিরীহ ছাপোষা চাকুরীজীবিরা-যারা চাকুরী হারানোর ভয়ে মুখে তালা দিয়েছিলেন যোগ দিয়েছিলেন তারাও। শুধু ছাত্রই নয়, তাদের সাথে ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকারাও।

এমন পরিস্থিতিতে গণভবন ছেড়ে পালিয়ে যায় প্রবল পরাক্রমশালী তৎকালীন সরকারপ্রধান, যিনি উদ্ধত কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে বিমান বাহিনীর এমআই‑১৭ হেলিকপ্টারে প্রথমে গণভবন থেকে তখনকার বিমানবাহিনী ঘাঁটি বঙ্গবন্ধুতে। পরে সেখান থেকে সি১৩০ জুলিয়েট হারকিউলিসে করে স্বজনসহ পালিয়ে যান ভারতের গাজিয়াবাদের হিন্দোন বিমান ঘাটিতে।

এরই মধ্যে গণমাধ্যমে খবর আসে। দেশ ছেড়ে পালিয়েছে শেখ হাসিনা। পতন হয়েছে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার। কিন্তু পরিস্কার কোনো ঘোষণা নেই। ২টায় সেনাপ্রধানের ভাষণ। সবার চোখ ছিল মোবাইল বা টিভিতে। তখনকার বাস্তবতায় বিশেষ করে বললে যমুনা টেলিভিশনে। ১ ঘণ্টা বিলম্বে বেলা ৩ টায় জাতির উদ্দেশ্যে দেষা ভাষনে সেনাপ্রধান নিশ্চিত করেন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা।

তখনই বিজয় উল্লাসে নামে পুরো জাতি। ছাত্র-জনতার জনসমুদ্র ততক্ষণে গণভবনে পৌঁছে যায় বিজয় মিছিল নিয়ে। গণভবনের প্রতিটি কোনায় তখন বাংলার মানুষের উপস্থিতি। পাশের লেকে নেমে গোসল করে হাজার হাজার মানুষ। সকলের মধ্যে তখন বিরাজ করছিল অদম্য-বুনো উল্লাস। আবেগ–আপ্লুত হয়ে কেউ কেউ কান্নাও করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কেউ আবার আদায় করেন নামাজ। শুধু গণভবন নয়, সংসদ ভবনেও বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে ছাত্র-জনতা। গণতন্ত্রকে ফিরে পাবার আনন্দেই যেন এমন উল্লাস-আনন্দ-আর হাসিমুখ।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও নিয়ন্ত্রণ নেয় সাধারণ মানুষ। বৈঠক রুম, দরবার হলসহ প্রতিটি কক্ষে মানুষ প্রবেশ করে। এসময় তারা কোটা বিরোধী আন্দোলনের নানা শ্লোগান দেয়ালে লিখে দেন। অনেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ছাদে উঠে। সেখানে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়।

সকলে যখন বিজয় উল্লাসে ব্যস্ত ঠিক তখনই রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে তখনও পুলিশ নির্বিচারে মানুষ মারছে। বিজয় উল্লাসে অংশ নিতে এসে লাশের স্তুপে পরিণত হয় অনেকেই। যাত্রাবাড়ি পুলিশ স্টেশনের সামনে সেই সহিংসতায় শুধু ঐদিনই মারা যায় ৫৫ জনের বেশি। শহরের আরেক প্রান্ত আশুলিয়ায় তখন নারকীয়ভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে আরও ৬ জনকে। এদিন বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী কয়েকটি থানায় হামলা ভাংচুর এবং আগুন দেয়।

রাস্তায় কারও হাতে লাল-সবুজের পতাকা। কেউবা মাথায় বেধেছেন লাল কাপড়। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে জয়ের উচ্ছ্বাস তাদের চোখে-মুখে। যেন পরাধীনতার শিকল ভাঙার আনন্দ-আয়োজন টিএসসি, শাহবাগ এলাকাও। এমন বিজয় উল্লাস কে দেখেছে কবে? যেন নতুন এক বাংলাদেশ। বাংলাদেশ টু পয়েন্ট ও।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অন্তর্বতীকালীন সরকারের মাধ্যমে দেশের কার্যক্রম চালানো হবে বলে জানান সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বিকেল সেনানীবাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেন তিনি।

বিজয়ের দিনে উচ্ছ্বাস-উল্লাসে যমুনা টেলিভিশনকে ভাগীদার করতে চেয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। যেখানেই যমুনার সহকর্মীরা গেছেন, তাদের মাটি থেকে তুলে অভিনন্দনে ভাসিয়েছেন।

এদিন, সন্ধ্যার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। ছিলেন বিএনপি-জামায়াত সহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও।

জুলাইয়ের এক তারিখে শুরু হওয়া টানা ৩৬ দিনের কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ হয় স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে। এই প্রজন্ম ৭১ না দেখলেও তারা সৃষ্টি করেছে নতুন এক বাংলাদেশের। যেখানে গণতন্ত্র, অধিকার ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের পথটা হবে ঋদ্ধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

আগামীকাল সিলেট যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: গ্যাস, সড়ক ও বিমানবন্দরে উন্নয়নের প্রত্যাশা

প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল শনিবার (২ মে) আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সিলেট সফর। প্রধানমন্ত্রীর...

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সরকার কি বাতিল করবে?

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র-এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার...

আজ মহান মে দিবস: শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক দিন

মহান মে দিবস আজ। ঐতিহাসিক মহান মে দিবস ২০২৬, রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করছে বাংলাদেশ। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। মে দিবস...

দুপুরের মধ্যে ঢাকাসহ ১৭ জেলায় ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা

ঢাকাসহ দেশের ১৭ জেলায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। একইসঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিরও আশঙ্কা রয়েছে। আজ শুক্রবার (১ মে) দুপুর...

Recent Comments