দক্ষিণ এশিয়ায় আম শুধু একটি গ্রীষ্মকালীন ফল নয়, বরং এটি বহু বছর ধরে হয়ে উঠেছে এক প্রকার কূটনৈতিক বার্তার মাধ্যম। বাংলাদেশের রংপুরের হাঁড়িভাঙা বা রাজশাহীর আম্রপালী হোক, কিংবা ভারতের মালিহাবাদী বা পাকিস্তানের সিন্ধ্রি—এই অঞ্চলের রাষ্ট্রনায়করা আমকে ব্যবহার করেছেন উপহার ও রাজনৈতিক বার্তার বাহক হিসেবে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উপহার পাঠিয়েছেন এক হাজার কেজির হাঁড়িভাঙা আম। শেখ হাসিনার সময় থেকে শুরু হওয়া এই ‘আম কূটনীতি’ অব্যাহত রেখেছে নতুন সরকার। ভারতের মিডিয়া এটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছে।
আম যে মোদির প্রিয় ফল, তা নতুন নয়। ছোটবেলায় গ্রামে গিয়ে গাছ থেকে আম পেড়ে খাওয়ার স্মৃতিও রয়েছে তার। সেই আবেগকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে আমের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে ঢাকা।
তবে কূটনীতির ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিযোগিতা বহু পুরোনো। ১৯৫৫ সালে নেহরু চীন সফরে গিয়ে উপহার দেন আমের চারা। একই সময়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাও সে তুংকে আম পাঠালে তা চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতীক হয়ে ওঠে। আমকে ফর্মালডিহাইডে রেখে পূজা করার নজিরও রয়েছে।
২০০৮ সালে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা দিতে পাকিস্তান উপহার পাঠায় আমের বাক্স, যদিও মুম্বাই হামলা সেই সম্পর্ককে ছিন্ন করে দেয়।
এমনকি ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়া উল-হক যে বিমানে নিহত হন, তাতে বোঝাই ছিল আমের বাক্স। অনেকে সন্দেহ করেন, সেই আমের মধ্যেই ছিল বিস্ফোরক—যা ছিল তার মৃত্যুর রহস্যময় কারণ।
বিশ্ববাজারেও আম নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র। ভারত, মেক্সিকো, পাকিস্তান এই তিনটি দেশ সবচেয়ে বেশি আম রফতানি করে, বাংলাদেশও রয়েছে শীর্ষ দশে। তবে রপ্তানির সুবিধা পায় পাকিস্তান, কারণ তাদের আমের ‘শেলফ লাইফ’ বেশি।
এই অঞ্চলে আম তাই শুধু ফল নয়, বরং সম্পর্কের সূক্ষ্ম বার্তা, বন্ধুত্বের হাতছানি, এমনকি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমও বটে।


