Wednesday, May 13, 2026
Home অর্থ-বানিজ্য আদানির সাথে চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারকে নোটিশ

আদানির সাথে চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারকে নোটিশ

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশ ও ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি আদানির মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি নিয়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ৬ নভেম্বর ২০২৪, বুধবার, সরকারের পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার এম কাইয়ুমের মাধ্যমে আদানির সঙ্গে সকল বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের জন্য একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এই নোটিশের মাধ্যমে অবিলম্বে ‘অন্যায্য একতরফা চুক্তি’ পুনর্বিবেচনা করার অথবা পুরোটাই বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে। নোটিশে পিডিবির (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) চেয়ারম্যান এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তিন দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যদি এই সময়ের মধ্যে চুক্তির পুনর্বিবেচনার কার্যক্রম শুরু না হয়, তাহলে উচ্চ আদালতে রিট করা হবে বলেও জানিয়েছেন ব্যারিস্টার কাইয়ুম।

বিদ্যুৎ চুক্তির পরিস্থিতি

এটি প্রথমেই উল্লেখ করা উচিত যে, বাংলাদেশের সঙ্গে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ চুক্তির শুরুটা ২০১৭ সালের দিকে, যখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিশেষত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অভাব ছিল। একদিকে আদানি গ্রুপের মতো বড় সংস্থার সাহায্যে বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন আসবে বলে আশা করা হয়েছিল, অন্যদিকে দেশীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিল।

তবে চুক্তির শুরু থেকেই কিছু সমস্যা দেখা দেয়। আদানি গ্রুপ, যা ভারতের অন্যতম বড় এবং শীর্ষস্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু এক বছর পরই কয়লার দাম বৃদ্ধির কারণে অশান্তি শুরু হয়। আদানি কোম্পানি ঘোষণা করে যে, তারা তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করবে।

চুক্তির বিতর্ক এবং নোটিশের প্রেক্ষাপট

আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে, যখন আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার দাম ২২ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায়। এই দাবির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আপত্তি জানায়। পিডিবি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কয়লা আমদানির দাম কমানোর প্রস্তাব দেয় এবং এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে এরপরেও আদানি গ্রুপ তাদের দাবি পূরণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে চাপে রাখতে থাকে।

এরই মধ্যে, গত অক্টোবরের শেষ দিকে আদানি গ্রুপ পিডিবিকে একটি চিঠি পাঠায়, যাতে তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে। আদানি জানায়, ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হলে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আদানির সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে এটি সফল হয়নি এবং আদানি ৩১ অক্টোবর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয়।

এখন, ৬ নভেম্বরের এই লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আদানি গ্রুপের একতরফা সিদ্ধান্ত এবং অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির কারণেই এই চুক্তি বাতিল করতে হবে। এমনকি সরকার এই নোটিশে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি গঠন করার দাবি জানিয়েছে।

ঋণ পরিশোধের চাপ এবং আদানির আল্টিমেটাম

এদিকে, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য ৭ নভেম্বরের মধ্যে একটি বিশাল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৮৪ কোটি ডলারের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কোটি ডলার পরিশোধ করার আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ না হলে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে এবং আরও ১৭ কোটি ডলার পরিশোধের জন্য একটি ঋণপত্র খোলার ব্যবস্থা করেছে, তবুও পরিস্থিতি অনিশ্চিত।

বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট এবং সরকারের করণীয়

এই পরিস্থিতিতে একদিকে আদানির ঋণ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার হুমকি, বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন সময়ের সৃষ্টি করেছে। পিডিবি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছেন যে, দেশের বিদ্যুৎ সংকট আরও ঘনীভূত না হয়, তবে আদানি গ্রুপের এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একদমই সুবিধাজনক নয়।

এছাড়া, সরকারের পক্ষ থেকে নোটিশে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, আদানি গ্রুপের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের জনগণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দ্রুত সমাধান করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গি

যদিও সরকার এবং আদানির মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে, তবে এটি স্পষ্ট যে, বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে এমন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করতে এবং দেশীয় খাতের সুবিধা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে, ভবিষ্যতে এমন চুক্তি করার সময় আরও সুস্পষ্ট এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা, যাতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি না হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে ৫০ লাখ প্রবাসী

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস...

প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি প্রাইম ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসি গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বুধবার (১৩...

প্রথম প্রান্তিকে ইবিএলের মুনাফায় ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল) ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সমন্বিত মোট মুনাফায় ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। শক্তিশালী বিনিয়োগ আয়, বৈদেশিক মুদ্রা আয় প্রবৃদ্ধি এবং প্রভিশনিং...

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের স্পন্সরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উন্মুক্ত ও জুনিয়র টেনিস টুর্নামেন্ট

বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের উদ্যোগে ১৪ মে থেকে ২০ মে পর্যন্ত জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্স, রমনা, ঢাকায় “শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক উন্মুক্ত ও জুনিয়র টেনিস টুর্নামেন্ট-২০২৬” অনুষ্ঠিত...

Recent Comments