জ্বালানি রূপান্তরে বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে দাবি করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু বিদ্যুতের দাম বা ব্যয়ের বিষয় নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাই এখন বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খরচ বেশি হলেও পূর্বানুমান থাকলে অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তা থাকলে কোনো পরিকল্পনাই কার্যকর হয় না।’ এ অনিশ্চয়তা কমাতে জ্বালানির উৎসের ভারসাম্য, সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর, কয়লা ব্যবস্থাপনা, গ্যাস অনুসন্ধান, পরিশোধন সক্ষমতা ও চাহিদা ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেয়ার আহ্বান জানান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উপদেষ্টা পূর্বাচল ও পূর্ব ঢাকা উন্নয়ন পরিকল্পনার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণে অনেক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।’ তার ভাষায়, ‘দেশে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। পরিকল্পনা তৈরি হলেও তা পর্যবেক্ষণের জন্য তাৎক্ষণিক তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ সূচক ও ধারাবাহিক নজরদারি ব্যবস্থা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ ঘাটতি দূর করতে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্লাটফর্ম গঠন প্রয়োজন। যারা জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে ও সরকারকে নীতি বাস্তবায়নে সহায়তা দেবে।’ একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে একত্র হয়ে শক্তিশালী সমন্বিত মতামত গড়ে তোলার আহ্বান জানান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান শফিকুল আলম। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখন একটি জটিল রূপান্তর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রাথমিক জ্বালানির বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর।’
বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে এ জ্বালানি বিশ্লেষক জানান, মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে। এরই মধ্যে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিগত অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
শফিকুল আলম আরো বলেন, ‘এলএনজির উচ্চ ও অস্থির বাজার এবং ডিজেল ও কয়লার দাম বাড়ায় পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস উৎপাদন কমে ৯৭৮ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’ এছাড়া সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রতি বছর প্রায় ৮ শতাংশ গ্যাস অপচয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এর বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব বলেও জানান তিনি।
এ জ্বালানি বিশ্লেষকের মতে, জ্বালানি রূপান্তর, বিকেন্দ্রীকৃত সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘২০২২ সালের পর বাংলাদেশে আর সস্তা গ্যাস ও জ্বালানি নেই; প্রতি বছর প্রায় ১০০ এমএমসিএফ গ্যাস উত্তোলন কমছে। শিল্প ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি সংকট উত্তরণে সরকার-ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ এবং বাস্তবসম্মত প্রস্তাব প্রয়োজন।’
বৈঠকে সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও গ্রিনটেক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উপদেষ্টা সিদ্দিক জোবায়ের বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না।’ এ সময় তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি স্টোরেজ, এনার্জি এফিশিয়েন্সি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের সদস্য ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার, শিল্প খাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, গবেষণা ও স্থানীয় প্রযুক্তি উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে আমদানিনির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ; বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি কেএম রেজাউল হাসনাত ডেভিড; বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম; বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, জ্বালানি বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।


