ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকহারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতর-এর পর এসব নিয়োগের বড় অংশ বাতিল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঈদের পর রদবদলের প্রস্তুতি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন নির্বাচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার রয়েছে। সে লক্ষ্যেই প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রমজান মাসে প্রস্তুতি চললেও ঈদের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশের নিয়োগ বাতিল করে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসন পুনর্গঠনে যোগ্যতা ও দক্ষতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে।
শীর্ষ পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা শেখ আব্দুর রশিদের চুক্তি বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেয়া একাধিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আসছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় অন্তত ১৮ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন। এদের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশন, নির্বাচন কমিশন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার শীর্ষ পদধারীরাও আছেন।
প্রশাসনে অস্বস্তি ও সমন্বয়হীনতা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয় বলে জানা গেছে। নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্বের কারণে বিভিন্ন দপ্তরে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।
এক অতিরিক্ত সচিবের ভাষ্য, নেতৃত্বস্থানীয় পদগুলো চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এর প্রভাব পড়ে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মত
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ব্যতিক্রমী যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যৌক্তিক হতে পারে। তবে এটি নিয়মে পরিণত হলে প্রশাসনের ভেতরে হতাশা সৃষ্টি করে এবং পদোন্নতি প্রত্যাশীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, শীর্ষ পদে অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের স্বাভাবিক গতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। একই মত দিয়েছেন সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারও। তার মতে, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এ ধরনের নিয়োগ দেয়া উচিত নয়।
আইন-শৃঙ্খলা ও অন্যান্য দপ্তর
চব্বিশের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পুলিশ প্রশাসনও সংকটে পড়ে। সে সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় বাহারুল আলমকে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তার অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (জনপ্রশাসন) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঈদের পর প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হলে তা দেশের আমলাতন্ত্রের কাঠামো ও কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


