আজ শুক্রবার পবিত্র শবে মেরাজ। ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত রাত।এই রাতেই মহান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কুদরতে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে সপ্তম আসমান পেরিয়ে আরশে আজিম পর্যন্ত অলৌকিক সফরের সৌভাগ্য লাভ করেন। এই ঐশী সফরই ইসলামে ‘ইসরা ও মেরাজ’ নামে পরিচিত।
মেরাজ অর্থ কি
মেরাজ আরবি শব্দ, শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আকাশপথে ভ্রমণ করা, সোপান ইত্যাদি। রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে জাগ্রত অবস্থায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা, এরপর বোরাকে করে ঊর্ধ্বাকাশ পাড়ি দেওয়ার মাধ্যমে আরশে আজিমে পৌঁছে আল্লাহর দিদার লাভ করার নামই মেরাজ। কোরআনে কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি বান্দাকে তাঁর নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ পবিত্র, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ১)
শবে মেরাজের বিস্তারিত ঘটনা
হাদিসের ভাষ্যমতে, মেরাজের সূচনা হয় মসজিদে হারাম থেকে। রাসুলুল্লাহ (স.) রজব মাসের ২৭-এর রজনীতে আল্লাহ তাআলার ঘরের হিজরের মাঝে শায়িত ছিলেন, এমন সময় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে জাগ্রত করে তাঁর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে দূষিত রক্ত বের করে আবার জোড়া লাগিয়ে দেন। অতঃপর বোরাকে করে সশরীরে বায়তুল মাকদাসে নিয়ে যান। বোরাক হলো এমন একটি প্রাণী, যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি জন্তু। তার দুই উরুতে রয়েছে দুটি পাখা। তা দিয়ে সে পেছনের পায়ে ঝাপটা দেয়, আর সামনের দৃষ্টির শেষ সীমায় পা ফেলে। প্রিয়নবী (স.) বায়তুল মাকদাসের দরজায় খুঁটির সঙ্গে বোরাকটি বেঁধে যাত্রাবিরতি করেন এবং সব নবীর ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম)
বায়তুল মাকদাসে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ আদায় করার পর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে সশরীরে প্রথম আকাশে, অতঃপর অবশিষ্ট আকাশগুলোয় গমন করেন। এ সিঁড়িটি কী এবং কেমন ছিল, তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ তাআলাই জানেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং প্রত্যেক আকাশে অবস্থানরত পয়গম্বরদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। প্রথম আকাশে হজরত আদম (আ.)-কে, দ্বিতীয় আকাশে হজরত ইয়াহিয়া ও ঈসা (আ.)-কে, তৃতীয় আকাশে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে, চতুর্থ আকাশে হজরত ইদরিস (আ.)-কে, পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.)-কে, ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-কে এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান। এসব স্থান অতিক্রম করে তিনি এক ময়দানে পৌঁছেন। যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা গমন করেন, যেখানে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি ইতস্তত ছোটাছুটি করছে। ফেরেশতারা স্থানটি ঘিরে রাখছেন। রাসুলুল্লাহ (স.) সেখানে হজরত জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর স্বরূপে দেখেন। তাঁর ছয় শ পাখা। সেখানে তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের ‘রফরফ’ দেখতে পান। রফরফ হলো সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট পালকি। রফরফের মাধ্যমে তিনি স্বীয় রবের কাছে গমন করেন। এ সফরে তাঁকে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়। তাঁকে দুধ ও মদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি দুধ গ্রহণ করেন। এটা দেখে হজরত জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি স্বভাবগত বস্তু গ্রহণ করেছেন। আপনি মদ গ্রহণ করলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। মহানবী (স.)-কে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়। জাহান্নামিদের শাস্তিও তিনি অবলোকন করেন। জাহান্নামের দারোগা মালেককে দেখেছেন। তাঁর চেহারায় হাসির কোনো ছাপ নেই।
কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, মেরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (স.) আল্লাহ তাআলার এতটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যে, দুজনের মধ্যখানে মাত্র এক ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল। এখানে রাসুলল্লাহ (স.)-এর উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বারবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতে মোহাম্মাদির ওপর ফরজ করেন, যা ইসলামের পাঁচটি রোকনের অন্যতম রোকন বা ভিত্তি। সহিহ বুখারির ৩৮৮৭ নং হাদিসে মেরাজের বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে।
শবে মেরাজের গুরুত্ব
মেরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরশে আজিম পর্যন্ত ঊর্ধ্বলোক গমনের সৌভাগ্য লাভ করেন। এ সময় তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দিদার লাভ করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ বিধান নিয়ে একই রাতে দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই কারণেই শবে মেরাজ মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ।
শবে মেরাজের রাতের আমল
এই রাতটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটানো উত্তম। যেমন
* পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত
* নফল নামাজ আদায়
* জিকির ও আসকার
* দোয়া ও দরুদ পাঠ
* আত্মসমালোচনা ও তওবা-ইস্তেগফার
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, এ রাতে নফল ইবাদত করবে এবং দিনে রোজা পালন করবে। (ইবনে মাজাহ) ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নামাজ; তাই নফল ইবাদতের মধ্যে নফল নামাজের গুরুত্ব বেশি। নফল ইবাদতের জন্য নতুন অজু করা এবং বিশেষ ইবাদতের আগে গোসল করাও মোস্তাহাব। ইবাদতের জন্য রাতের সময় দিন অপেক্ষা অধিক ফজিলতপূর্ণ।
শবে মেরাজের রাতের ফজিলত
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন—
“এই রাত এলে তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনে রোজা রাখো। কেননা সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করেন— কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দেব। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে উদ্ধার করব।”


