জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরকে ঘিরে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি। বরং জাতিসংঘের বক্তব্য আগের মতোই গতানুগতিক রয়ে গেছে, যা বাস্তব পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হওয়ার বদলে কেবল নীতিগত আলোচনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকছে।
সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন গুতেরেস, যেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখেছেন। এ সময় তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে মিয়ানমারে নিরাপত্তা ও শান্তির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এটি শুধু বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।”
তবে এই বক্তব্যকে নতুন কিছু নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “জাতিসংঘের ভূমিকা এখনো মূলত কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা দরকার। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এখন পর্যন্ত কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি।”
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন আট বছরেও সম্ভব হয়নি। বরং মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার কারণে নতুন করে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, “বাংলাদেশ কেবল জাতিসংঘের দিকে চেয়ে থাকলে হবে না। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতায় আসার চেষ্টা করতে হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে হবে।”
জাতিসংঘ মহাসচিব আশ্বাস দিয়েছেন যে, রোহিঙ্গাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার সংস্থা কাজ করে যাবে। তবে দাতাদের অনুদান কমতে থাকায় এই সহায়তা কতদিন অব্যাহত থাকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে এগোতে হবে। জাতিসংঘ মহাসচিবের সফর রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে নতুন কোনো দিক উন্মোচন করেছে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল বিবৃতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হয়ে বাংলাদেশের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করবে।


