দেশের ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা আরও কমেছে। ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকে নারী কর্মী কমেছে ৭২১ জন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কমেছে ৪৯ জন। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মোট নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৭৭০ জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত নারী–পুরুষ সমতা বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৬১ জনে। এর আগে গত জুন শেষে ব্যাংকে নারী কর্মী ছিল ৩৫ হাজার ৭৮২ জন। সেই হিসাবে ছয় মাসে ব্যাংক খাতে নারী কর্মী কমেছে ৭২১ জন।
একইভাবে ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯ জনে। গত বছরের জুন শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৮ জন। ফলে ছয় মাসে এ খাতে নারী কর্মী কমেছে ৪৯ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের ৬১টি ব্যাংক ও ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮২ হাজার ৪০৭ জন এবং নারী কর্মী ৩৬ হাজার ৮০ জন। অর্থাৎ খাতটিতে মোট কর্মীর প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ নারী এবং সাড়ে ৮৩ শতাংশ পুরুষ।
ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংকটে থাকা বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত বা বন্ধের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের অনুমোদনে নেওয়া এসব উদ্যোগের ফলে অনেক নারী কর্মী চাকরি হারিয়েছেন বা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক কারণেও অনেক নারী কর্মক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪৮৪ জন। পাঁচ বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৭ জনে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে কর্মী বেড়েছে প্রায় ২৯ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ কর্মী বেড়েছে ২২ হাজার ৩১৬ জন এবং নারী কর্মী বেড়েছে ৬ হাজার ৬৮৭ জন।
২০২০ সালে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মোট কর্মীর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ নারী ছিলেন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে গত বছর শেষে সাড়ে ১৬ শতাংশে দাঁড়ালেও গত বছরের শেষ ছয় মাসে নারী কর্মীর সংখ্যা আবার কমে গেছে।
এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অনিতা গাজী রহমান বলেন, শুধু ব্যাংক নয়, প্রায় সব কর্মক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ কমছে। অথচ শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা মেধায় এগিয়ে থাকেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এসে সেই চিত্র বদলে যায়।
তার মতে, পরিবার, সমাজব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। ফলে একটি পর্যায়ে এসে অনেক নারী কর্মক্ষেত্র ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বিশেষ করে পরিবার ও সন্তান দেখভালের দায়িত্বের কারণে অনেক নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। এ পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে সমাজ, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কর্মরত নারীদের বেশির ভাগই বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করেন। গত বছর শেষে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে নারী কর্মী ছিলেন ২২ হাজার ৯৮৩ জন। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ছিলেন ৯ হাজার ১৪৭ জন নারী কর্মী। এ ছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকে ১ হাজার ৯৪৭ জন এবং বিদেশি ব্যাংকে ৯৮৪ জন নারী কর্মী কর্মরত ছিলেন।
শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী রয়েছে বিদেশি ব্যাংকে। এসব ব্যাংকের মোট ৩ হাজার ৯৩১ কর্মীর মধ্যে ৯৮৪ জন নারী, যা ২৫ শতাংশের বেশি। যদিও সংখ্যার হিসাবে বেসরকারি ব্যাংকে নারী কর্মী সবচেয়ে বেশি, তবে মোট কর্মীর অনুপাতে সেখানে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ১৬ শতাংশ।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ব্যাংক খাতে নারীদের বেশির ভাগই কর্মজীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে রয়েছেন—এ হার ১৭ শতাংশের বেশি। মধ্যবর্তী পর্যায়ে নারী কর্মীর হার ১৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে নীতিনির্ধারণী বা উচ্চপর্যায়ে নারীর উপস্থিতি সবচেয়ে কম, যেখানে নারী কর্মীর হার মাত্র ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।


