অর্থ সংকটের কারণে সরকার দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে রফতানির বিপরীতে প্রণোদনা দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে গতকাল এক বৈঠকে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের হাতে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি তুলে দেয়া হয়। পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান ও সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী। সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি-মার্চের ৬০ দিনের মধ্যে প্রায় ২৫ দিন কারখানা বন্ধ থাকবে। অথচ মার্চে নিয়মিত (ফেব্রুয়ারি) মজুরি ছাড়াও ঈদ বোনাস ও মার্চের অগ্রিম ৫০ শতাংশ মজুরি পরিশোধ করতে হবে। ফলে এক মাসেই প্রায় দ্বিগুণ বেতন-ভাতা দেয়ার চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, পোর্ট চার্জ বৃদ্ধি এবং ব্যাংক সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় তারল্য সংকট আরো গভীর হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তা ছাড়া শ্রমিকদের সময়মতো মজুরি দেয়া কঠিন হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও পরবর্তী মাসগুলোয় নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। ডিসেম্বরে রফতানি ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে যায়। একই সঙ্গে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপের কারণে রফতানিকারকরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না।
চিঠিতে আরো বলা হয়, রফতানি অর্ডারের ক্ষেত্রে কারখানাগুলো সাধারণত ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে ৭০-৭৫ শতাংশ কাঁচামাল সংগ্রহ এবং প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় মজুরি ও পরিচালনায় ব্যয় করে থাকে। কিন্তু ডেফার্ড শিপমেন্ট ও অর্ডার পিছিয়ে যাওয়ায় মূলধন দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে এবং একক ঋণগ্রহীতা সীমা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিজিএমইএ গভর্নরের কাছে বিশেষ বিবেচনায় প্রচলিত ঋণসীমার বাইরে গিয়ে দুই মাসের মজুরির সমপরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ঋণে তিন মাস গ্রোস পিরিয়ড রেখে ১২ মাসে পরিশোধের সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বিজিএমইএর হিসাবে খাতটিতে এক মাসের মোট বেতন ব্যয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে প্রণোদনা বিতরণে বর্তমান ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সংগঠনটি চিঠিতে উল্লেখ করেছে। বিজিএমইএ মনে করে, এসএমই কারখানাগুলোর জন্য আলাদা বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজেট বরাদ্দ থেকে প্রাপ্ত অর্থের ক্ষেত্রে প্রথমে এসএমই খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেয়া উচিত। এরপর অবশিষ্ট অর্থ বড় কারখানাগুলোর মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে।
বিজিএমইএ নেতাদের উত্থাপিত প্রস্তাবের জবাবে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘কারখানাগুলো যাতে উৎসবের আগে শ্রমিকদের প্রতি তাদের আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণ করতে পারে, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সংকট লাঘবে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বকেয়া নগদ প্রণোদনা দ্রুত ছাড় দেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অগ্রাধিকার দেবে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের ক্ষেত্রে।
এদিকে বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে দাবি করে বিজিএমইএ জানিয়েছে, প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন গভর্নর। পাশাপাশি আগামীতে প্রণোদনা বিতরণের সময় এসএমই খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে বেতন-ভাতা সহায়তা-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে উত্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন গভর্নর। সংগঠনটির দাবি, গভর্নর কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি এবং প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
বিজিএমইএ বলছে, তারা নতুন কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং জমে থাকা প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় এবং যৌক্তিক ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি সহায়তা চেয়েছেন।


