দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সরকারকে এমন সব উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ব্যবসা করা সহজ হয়। একই সঙ্গে করের নায্যতা নিশ্চিতে করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়িয়ে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকার বাইরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও করের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তারা। এ জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তা কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আগামী অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর যৌথভাবে এর আয়োজন করে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
আয়কর ও ভ্যাট বিষয়ে ডিসিসিআই বলেছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অত্যন্ত কম। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬.৭ শতাংশ, যা উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার সামির সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের মোট কর আহরণের প্রায় ৮০ শতাংশই ঢাকা থেকে আসে, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বড় বৈষম্য নির্দেশ করে। তিনি প্রশ্ন তোলেন—‘বাকি বাংলাদেশ কোথায়?’ এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে একটি সমন্বিত ‘ম্যাপিং প্রোগ্রাম’ গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। এর মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় কী ধরনের ব্যবসা—ফরমাল ও ইনফরমাল—চলছে তা শনাক্ত করে সেগুলোকে কর নেটের আওতায় আনার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, একই করদাতাদের ওপর বারবার করের চাপ বাড়ালে তারা নিরুৎসাহিত হবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে কর নেট সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান মিশনের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ ঋণ কিস্তি পেতে কর আহরণ বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট মো. কাউসার আলম বলেন, বাজেট ও রাজস্ব নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, দেশ পরিচালনায় সহায়তা এবং নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। তবে বর্তমান বাজেটে করদাতা—বিশেষ করে ব্যবসায়ী, ব্যক্তি করদাতা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টেকসই অংশগ্রহণ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একদিকে মাথাপিছু আয় বাড়লেও অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়া একটি বড় বৈপরীত্য। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল করনীতির প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাজেটকে সহজ, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং ভ্যাট ব্যবস্থায় রিয়েল-টাইম ইন্টিগ্রেশন জরুরি। একই সঙ্গে বহুমাত্রিক করহার ও জটিল কাঠামো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিভ্রান্তি তৈরি করে উল্লেখ করে তিনি এ ক্ষেত্রে যৌক্তিক সংস্কারের আহ্বান জানান। ন্যূনতম কর ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, লাভ না করলেও কর দিতে বাধ্য করা ব্যবসার জন্য টেকসই নয়।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কর ব্যবস্থার অটোমেশন নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, কর প্রশাসনের অপ্রয়োজনীয় চাপ ও দুর্নীতি ব্যবসার অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য পূরণে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনতে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই-ভিত্তিক রিস্ক প্রোফাইলিং চালু করা জরুরি। এতে আমদানি-রপ্তানিতে মিসডিক্লারেশন ও রাজস্ব ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি কর আহরণ ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপনে কর সুবিধা দিলে বিনিয়োগ ছড়িয়ে পড়বে। ব্যাংকিং খাতে চাপ, টাকা ছাপানো এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়ে তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাস্তবমুখী ব্যয়ের ওপর জোর দেন।


