দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় এবং সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশের পঞ্চম ব্যাংক হিসেবে এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের গ্রাহক আস্থা, সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং সতর্ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহ শেষে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা পাঁচটি। এগুলো হলো—সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক এবং সর্বশেষ যুক্ত হওয়া পূবালী ব্যাংক। এর মধ্যে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং দুটি বেসরকারি ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতে এক লাখ কোটি টাকার আমানতকে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সক্ষমতার সূচক হিসেবে দেখা হয়। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এই মাইলফলক স্পর্শ করে। পরে ২০২০ সালের জুনে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এই তালিকায় যুক্ত হয়। ২০২১ সালে অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকও এক লাখ কোটি টাকার আমানতের সীমা অতিক্রম করে। সর্বশেষ পূবালী ব্যাংকও সেই তালিকায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করল।
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সোনালী ব্যাংকের আমানত দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে জনতা ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
পূবালী ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির গতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ২০২২ সালের শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। এরপর মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। গত বছরের শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকায়।
এই প্রবৃদ্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৬৩ বছরে যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ হয়েছিল, তার প্রায় সমপরিমাণ নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন বছরে। ফলে ব্যাংকটির সম্প্রসারণের গতি এবং গ্রাহকভিত্তির বিস্তার ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
পূবালী ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ নামে। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে ব্যাংকটি জাতীয়করণ করা হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় পূবালী ব্যাংক। তবে জাতীয়করণের পর বিভিন্ন সময়ে ঋণ অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থায় চাপ তৈরি হয়। ১৯৮৪ সালের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৮৪ সালে সরকার ব্যাংকটিকে আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেয়। মাত্র ১৬ কোটি টাকার বিনিময়ে ব্যাংকটির শেয়ার হস্তান্তর করা হয়। এর ফলে স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা ও তাঁদের উত্তরসূরিদের একটি অংশ পুনরায় মালিকানায় ফিরে আসেন।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ফেরার পর পূবালী ব্যাংকে ধাপে ধাপে পরিচালনাগত সংস্কার শুরু হয়। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং করপোরেট সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদি এসব উদ্যোগের ফলেই ব্যাংকটি ধীরে ধীরে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শুধু আমানতেই নয়, অন্যান্য আর্থিক সূচকেও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। গত বছরের হিসাবে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে সেই ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ঋণের গুণগত মানের দিক থেকেও ব্যাংকটি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে যেখানে গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ। ফলে সম্পদের মান এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির অবস্থান অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভালো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে পূবালী ব্যাংক। গত বছরে ব্যাংকটির মাধ্যমে ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি এবং ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে এসেছে ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার প্রবাসী আয়।
আর্থিক কার্যক্রমের এই ধারাবাহিকতার প্রভাব পড়েছে মুনাফাতেও। গত বছর পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
গ্রাহকসেবা সম্প্রসারণেও ধারাবাহিক বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে দেশজুড়ে ব্যাংকটির ৫১৯টি শাখা এবং ২৯০টি উপশাখা রয়েছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি এটিএম ও নগদ অর্থ জমা ও উত্তোলন সুবিধাসম্পন্ন বুথ পরিচালনা করছে ব্যাংকটি।
ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। পূবালী ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পাই’ বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ সক্রিয় গ্রাহক ব্যবহার করছেন। এছাড়া সারা দেশে ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট পয়েন্ট অব সেলস টার্মিনাল এবং প্রায় দেড় লাখ বাংলা কিউআর কোড স্থাপন করেছে ব্যাংকটি। ফলে নগদ অর্থ ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকেরা।
ডিজিটাল অনবোর্ডিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই কয়েক মিনিটের মধ্যে নতুন হিসাব খোলা সম্ভব হচ্ছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবা নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে এবং আমানত বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পূবালী ব্যাংকের শক্তিশালী গ্রাহকভিত্তি, সম্পদের গুণগত মান, নিরাপদ ঋণ পোর্টফোলিও, করপোরেট সুশাসন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির কৌশল প্রতিষ্ঠানটিকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশব্যাপী বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কের পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল সেবার কারণে গ্রাহকেরা সহজে ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আস্থা ও বিশ্বাসের ফলেই আমানতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করায় নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতেও ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


