দেশের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার মধ্যে বড় বড় প্রকল্পে বিপুল ব্যয় অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়ছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ইতোমধ্যে সতর্কসংকেত দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও ব্যয়ে শৃঙ্খলা না আনলে সামনে কঠিন সময় আসতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ঋণ-রাজস্ব অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৬.৯২ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ১৬.৫৩ শতাংশ। সতর্কসীমা ১৮ শতাংশ। International Monetary Fund ১৮ শতাংশকে ঝুঁকিপূর্ণ সীমা হিসেবে বিবেচনা করে। রাজস্ব আয় দ্রুত না বাড়লে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, জিডিপির তুলনায় ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৮.৯৯ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ১৭.০৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭.২৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৬৮.৮২২ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে ঋণ বেড়েছে ৮.৪৫৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকার নিট ৫.৮৩২ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ নিয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে প্রায় ২.৫১০ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে পরিশোধের চাপও। সুদ পরিশোধের অনুপাত বেড়ে হয়েছে ২.৯৬ শতাংশ। ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে মোট ঋণ অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৮.১২ শতাংশে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৬ বছরে ঋণ বেড়েছে ৩৭৭ শতাংশ। একই সময়ে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বরং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে—২৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে ঘাটতি ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি এবং ভ্যাট খাতে ১৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা এবং প্রশাসনিক জটিলতাকে এ ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
International Monetary Fund–এর ‘আর্টিকল ফোর কনসালটেশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের দায় রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮.৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে ১০১.২৪ বিলিয়ন ডলার অভ্যন্তরীণ এবং ৮৭.৫৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ।
গবেষণায় ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নেওয়া ৪২টি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৯টি প্রকল্পে গড়ে ৭০.৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ৩৫ শতাংশ ব্যয় দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে অপচয় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সরাসরি সরকার-টু-সরকার চুক্তির প্রকল্পগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বেশি ব্যয়বহুল হয়েছে।
ইআরডি সূত্র জানায়, বিদায়ী অর্থবছরে রেকর্ড ৪.০৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ কোটি ডলার বেশি। চলতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণের চাপ বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।


