নর্থবেঙ্গল জুট মিলের কার্যক্রম ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, মালিকানা সংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাবের একটি জটিল চিত্র উঠে এসেছে। মিলের সাবেক মালিক ও বর্তমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ব্যাংক ঋণ শোধ না করেই দু’দফায় মিল বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এতে ভুক্তভোগী হয়েছেন প্রথম ক্রেতা মাহবুবুর রহমান।
২০২২ সালে নর্থবেঙ্গল জুট মিল প্রথমবার বিক্রি করা হয় মাহবুবুর রহমানের ওয়েফেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের কাছে। বিক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, মিলের জমি, মেশিনারিজ ও শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। মাহবুবুর রহমান ৯ কোটি টাকা এককালীন পরিশোধের শর্তে ব্যাংকের ঋণ পুনঃতালিকাভুক্ত করে মিলটি চালু করেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এ মিল সংস্কার করে ৩০ জন ইঞ্জিনিয়ার ও ১৬৫ জন শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। রপ্তানির জন্য ১.৬২ মিলিয়ন ডলারের অর্ডারও নিশ্চিত করা হয়।
তবে মিল পরিচালনার মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, সাবেক মালিক আবুল কাশেম রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মিলটি দ্বিতীয়বার বিক্রির চেষ্টা করছেন।
২০২৩ সালে মিলটি দ্বিতীয়বার বিক্রি করা হয় নুরুল ইসলাম ডাবলুর কাছে। প্রথম বিক্রয়ের শর্তাবলী অগ্রাহ্য করে এবং ব্যাংকের অনুমোদনে এ বিক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। নুরুল ইসলাম ডাবলু দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনেই মিলটি ক্রয় করেছেন এবং ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছেন। তবে মিলের দ্বিতীয় বিক্রয় নিয়ে আদালতে মামলা চলমান
প্রথম ক্রেতা মাহবুবুর রহমান অভিযোগ করেছেন, মিলের দ্বিতীয় বিক্রয়ের সময় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম ব্যবহার করে তার উদ্যোগগুলো ব্যাহত করা হয়েছে। এমনকি মিলের মালিকানা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অন্যদিকে, অর্থায়নকারী জনতা ব্যাংক জানায়, প্রথম পক্ষ ঋণ পুনঃতালিকাভুক্ত করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে ব্যাংক দ্বিতীয় পক্ষের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের এজিএম শামীম আহমেদ বলেন, “শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনুমোদন নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
নর্থবেঙ্গল জুট মিল নিয়ে এ পর্যন্ত তিনটি মামলা হয়েছে। একটি মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই)। পিবিআই’র রংপুর পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন জানান, “মামলার তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে।”
বর্তমানে মিলটি চালু থাকলেও ঋণখেলাপি সংকট পুরোপুরি কাটেনি। প্রথম ক্রেতা মাহবুবুর রহমান অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
নর্থবেঙ্গল জুট মিলের পরিস্থিতি দেশের রুগ্ণ শিল্প পুনরুজ্জীবনের চেষ্টার মাঝে একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক অনিয়ম ও মালিকানা জটিলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও উন্মোচিত করছে।


