বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী গত কয়েক মাসে নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে, এবং এর পরিণামে শত শত থানায় হামলা, গাড়ি পোড়ানোসহ পুলিশের বহু সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছে, এবং কয়েকশ’ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। কিন্তু এসব সমস্যার মধ্যেও পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন কিংবা আচরণে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
পুলিশ বাহিনীর পুরনো সদস্যদের অনেকেই এখন নতুন দায়িত্বে আসছেন, তবে তাদের মধ্যে অনেকেই কেবল নিজেদের পদ বজায় রাখতে ব্যস্ত রয়েছেন, ফলে মাঠে কোনো কার্যকর পরিবর্তন ঘটেনি। পুলিশের বেশ কিছু সদস্য বদলি বাণিজ্যের অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ও বিশেষ কর্মকর্তাদের আনুকূল্যকে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে বাহিনীটির মনোবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং বর্তমানে তারা নিজেদের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাহিনীতে সংস্কারের অভাবের কারণে পুলিশ এখনো পুরনো ধ্যান-ধারণায় আটকে আছে। এমনকি যারা নিজেদের পদ পরিবর্তন করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই রাতারাতি হয়ে গেছেন ‘বঞ্চিত’ এবং ‘আওয়ামী বিরোধী’ কর্মকর্তা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ বাহিনী আজও শত বছরের পুরনো সংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে রয়েছে, এবং তারা সংস্কার ছাড়া এগোতে পারবে না।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ বাহিনীকে যদি পেশাদারিত্বের দিকে নিয়ে যেতে হয়, তবে তাদেরকে নিজেরাই পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশের উচিত নিজেদের কার্যক্রম ও কাঠামোগত পরিবর্তন তাদের ইচ্ছেমতো করা, যাতে বাহিনীটি প্রকৃত পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় পুলিশ বাহিনী তাদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত, এবং রাজনৈতিক দলের প্রভাবের কারণে তাদের পেশাদারিত্ব ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
ড. হাফিজুর রহমান কার্জন আরও জানান, বর্তমানে পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সরকার এবং রাজনৈতিক দলের প্রভাবের কারণে পুলিশ তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে না, এবং এতে অনেক সময় অনিয়ম ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য আইনগত পরিবর্তন জরুরি। বিশেষ করে পুলিশের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বাইরে একটি স্বাধীন কমিশনের হাতে দেওয়া উচিত।
ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশের আইন ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হলে একটি পৃথক পুলিশ কমিশন গঠন করা জরুরি। তিনি আরও জানান, পুলিশ বাহিনীর নিয়োগ, পদোন্নতি এবং অন্যান্য বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন সংস্থা প্রয়োজন। এমন সংস্কারের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা এবং পেশাদারিত্ব আনা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হলে তাদের ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোর উপর মৌলিক সংস্কার করা প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করতে হলে বাহিনীর পরিচালনা, নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন এবং স্বচ্ছ নীতিমালা প্রবর্তন করতে হবে।
পরিশেষে, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন এবং যথাযথ আইনগত কাঠামো প্রয়োজন, যাতে বাহিনীটি নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।


