আগামী অর্থবছরে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যা ২০ শতাংশ বেশি। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকা এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী উল্লেখ করে এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। কেননা চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ বা তিন লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে।
এমসিসিআইর মতে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়তে পারে। অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগকে এমসিসিআই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
গতকাল শুক্রবার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমসিসিআই এই মূল্যায়ন তুলে ধরে। সংগঠনটি বলেছে, বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য করনীতি সংস্কার, কর প্রশাসনের অটোমেশন, সিস্টেমলস কমানো, প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় অধিকতর গতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে করজাল সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আইএমএফের শর্ত পূরণে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি না করে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এমসিসিআই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, চলতি অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ কমার ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে। আগামী অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ বলে এমসিসিআই মনে করে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে এমসিসিআই স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়ানস্টপ ডিজিটাল সেবা, এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ চুক্তি সম্প্রসারণর পরিকল্পনা এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে চেম্বার মনে করে।
এমসিসিআই উৎসে কর-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছে। আয়কর আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন না করলে সম্পূর্ণ ব্যয়কে ‘অননুমোদনযোগ্য’ হিসেবে গণ্য করে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর-দায় আরোপ করা হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিধান সংশোধন করে সম্পূর্ণ ব্যয়কে অননুমোদনযোগ্য ঘোষণা করার পরিবর্তে শুধু বকেয়া উৎসে কর এবং তার ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা করব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করবে এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত করঝুঁকি হ্রাস করবে।
এমসিসিআই কোম্পানির ন্যূনতম টার্নওভার কর যৌক্তিকীকরণ বা কমাতে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এ ছাড়া, ন্যূনতম টার্নওভার কর ফেরত প্রদানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় লাভ না করেও টার্নওভারের ভিত্তিতে কর প্রদানের এই বাধ্যবাধকতা ব্যবসার নগদ প্রবাহ, পুনর্বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কোম্পানির করযোগ্য আয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পারকুইজিটের সীমা ২০ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা, আপ্যায়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে টার্নওভারের ৪ শতাংশ অথবা প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে যা কম, তা অনুমোদনের বিধান এবং প্রচারণামূলক ব্যয়ের অনুমোদিত সীমা টার্নওভারের ০.৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবকে এমসিসিআই স্বাগত জানিয়েছে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যয়ের অধিকতর স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে, করযোগ্য আয় নির্ধারণে ন্যায্যতা বাড়বে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও করের চাপ কিছুটা লাঘব হবে।


