Tuesday, May 19, 2026
Home জাতীয় বাংলাদেশে আঘাত হানা যত ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশে আঘাত হানা যত ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়কে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক শাহ আলম বলেন, সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ছিল ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়। এরপরে তিনি সাইক্লোন সিডরের কথা উল্লেখ করেন।

১৯৭০ এর ঘূর্ণিঝড়: ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর সবোর্চ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রামে আঘাত হানা এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ১০-৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল।

যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে ১৯৭০ এর সালের প্রবলতম ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়।

সেসময় ১০-৩৩ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল এবং অসংখ্য গবাদি পশু এবং ঘরবাড়ি ডুবে যায়।

সাবেক পরিচালক শাহ আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, অনেকে মনে করেন মৃতের সংখ্যা আসলে ৫ লাখেরও বেশি ছিল।

তিনি বলেন, “৭০ এর সাইক্লোন থেকেই মূলত মোটামুটিভাবে মনিটর করা শুরু হয়। সেই ঘূর্ণিঝড়টা সরাসরি বরিশালের মাঝখান দিয়ে উঠে আসে। ভোলাসহ অনেক এলাকা পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।”

১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়: উরিরচরের ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত এই সাইক্লোনটি যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৫৪ কিলোমিটার। মিস্টার আলম বলেন, “এটা অল্প জায়গায় হয়েছে ফলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি ছিলনা”।

১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়: নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে এই ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ১২-২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২২৫ কিলোমিটার।

১৯৯১ সালের ২৯-৩০শে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়কে আখ্যা দেয়া হয় ‘শতাব্দীর প্রচণ্ডতম ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে যাতে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায় বলে জানা যায়। যদিও বেসরকারি সংগঠনের দাবি অনেক মাছধরার ট্রলার সাগরে ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন আরও অনেকে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক কোটি মানুষ।

আবহাওয়া বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মিস্টার আলম বলেন, “এই সাইক্লোনে অনেক পানি হয়েছিল। অনেক মানুষ মারাও গিয়েছে। যদিও পূর্বাভাস ভালো ছিল, ২৭ ঘণ্টা আগে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “সাধারণত ২/৩ ঘণ্টার বেশি সাইক্লোন থাকেনা। কিন্তু এটি ছয়-ঘণ্টার বেশি সময় বাতাস বইতে থাকে”।

মিস্টার শাহ আলম জানান, ২২৪ কিলোমিটার বেগে আসা এই ঘূর্ণিঝড়ে তেলের ট্যাংকার পর্যন্ত ওপরে উঠে গিয়েছিল।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬০ সাল থেকে ২০০৭ সালে সিডরের পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৭ সালে প্রথম স্পষ্ট নামকরণ করা হয়। ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এবং ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে নিয়ে আসা সেই ঘূর্ণিঝড় ছিল সিডর যাকে সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম উইথ কোর অব হারিকেন উইন্ডস (সিডর) নাম দেয়া হয়।

ঘূর্ণিঝড় সিডর
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর দেশের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় সিডর প্রায় ছয় হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল৷ যদিও রেড ক্রিসেন্টের হিসাবমতে প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার৷ উত্তর ভারত মহাসাগরে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে সৃষ্ট এ ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ২৬০ থেকে ৩০৫ কিলোমিটার৷

সিডর খুলনা ও বরিশাল এলাকায় তাণ্ডব চালায়৷ সমুদ্র থেকে উঠে আসা ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে সব কিছু ভেসে যায়৷ ঝড়ে তিন হাজারের বেশি প্রাণহানি হয়৷ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩২টি জেলার ২০ লাখ মানুষ৷ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ছয় লাখ টন ধান নষ্ট হয়ে যায়৷ সুন্দরবনের প্রাণীদের পাশাপাশি অসংখ্য গবাদিপশু ‍মারা যায়৷

ঘূর্ণিঝড় আইলা
আইলা ২০০৯ সালে উত্তর ভারত মহাসাগরে জন্ম নেওয়া একটি ঘূর্ণিঝড়। ২১ মে ভারতের কলকাতা থেকে ৯৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে এর উৎপত্তি। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ এবং ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আইলা আঘাত হানে ২৫ মে।

এই ঘূর্ণিঝড় ভারতের ১৪৯ জন ও বাংলাদেশের ১৯৩ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়৷ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে উপকূলে প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন হয়৷ বাংলাদেশে পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে আইলা। এর প্রভাবে খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়।

ঘূর্ণিঝড় মহাসেন
ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ ২০১৩ সালের ১৬ মে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে৷ এর বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার৷ এই ঝড় বাংলাদেশে ১৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়৷

ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু ২০১৬ সালে ২১ মে বাংলাদেশের উপকূল এবং ভারতে অল্প কিছু অঞ্চলে আঘাত হানে৷ ধারণা করা হয়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ব্যাপ্তি ছিল দুটি বাংলাদেশের সমান আকৃতির৷ রোয়ানু’র আঘাতে চট্টগ্রামে ২৬ জনের মৃত্যু হয়৷

ঘূর্ণিঝড় মোরা
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় মোরা ২০১৭ সালের ৩০ মে ১৪৬ কিলোমিটার বাতাসের গতিতে কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে৷ ঝড়ের তাণ্ডবে হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়৷ কক্সবাজারে বিদ্যুৎব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে৷ জমির ফসল এবং লবণচাষিদের জমানো লবণ নষ্ট হয়ে যায়৷ দুই নারীসহ তিনজন মারা যায়৷

ঘূর্ণিঝড় ফণী
২০১৯ ‍সালের ৩ মে বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে বাংলাদেশে নয়জনের মৃত্যু হয়৷ তবে প্রাণহানি কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি৷

সেই সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ঘূর্ণিঝড় ফণীতে ৬৩ হাজার ৬৩ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ ১ হাজার ৮০৪ হেক্টর। ওই ঝড়ে ২ হাজার ৩৬৩টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ এবং ১৮ হাজার ৬৭০টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার। এছাড়া ৩৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। ফণীর প্রভাবে ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে একজন করে এবং বরগুনায় দুজনসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল
বারবার দিক বদল করে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অতিপ্রবল এই ঘূর্ণিঝড় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপ উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগ দিয়ে বাংলাদেশে আসায় ক্ষয়ক্ষতি আশঙ্কার চেয়ে কম হয়৷ আক্রান্ত হয় বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর ২০ লাখ মানুষ। এই ঝড়ে প্রাণ হারায় কমপক্ষে ১৭ জন। ফসলের ক্ষেত আক্রান্ত হয় প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর। এর মধ্য দুই থেকে পাঁচ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। মাছ নষ্ট হয় প্রায় ৪৭ কোটি টাকার।

‘বুলবুলে’ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর অন্যতম ছিল সাতক্ষীরা। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে শুধু সাতক্ষীরায় প্রায় ১৭ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং ৩৫ হাজার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় ৫ হাজার ১৪টি চিংড়ি ঘের৷

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান
করোনাভাইরাসের সংকটকালে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। উত্তর থেকে দক্ষিণ— পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই ঘূর্ণিঝড়ে। ২০২০ সালের মে মাসের এই ঝড় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রায় ২৮ ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালায়। এতে দেশের ছয় জেলায় ২১ জন মারা যায়।

ঝড়ের পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ক্ষতির হিসাব অনুসারে, ২৬টি জেলার মোট ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয় আম্ফানে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২০০টি সেতু ও কালভার্ট। ১৩ জেলার ৮৪টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে যায়। এসব ভাঙা বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার। আম্ফানে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলের ক্ষেত। ১ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ১৭ জেলায় ৪৭ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ক্ষেত ও ৭ হাজার ৩৮৪ হেক্টর আমবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঝড়ের পর থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। আম্ফানের কারণে দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরের ২৫ জেলার দেড় কোটি গ্রাহক ঝড়ের আগেই বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এসব জেলার বেশির ভাগ স্থানে ঝড় শুরু হওয়ার ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা আগেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং বাংলাদেশ উপকূলে আঘাতের সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭৫ কিলোমিটার। রাজধানীসহ দেশের অন্তত ২০ জেলায় বাড়ি ও উন্মুক্ত স্থানে; বিশেষ করে, পার্ক ও সামাজিক বনায়ন হয়েছে এমন এলাকায় অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়ে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি ও দমকা বাতাসের কারণে আমন ধানের গাছ হেলে পড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ইতালির রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন–এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির...

সরকারি কর্মীদের জন্য নতুন আইন হচ্ছে

সরকারি কর্মচারীদের জন্য সরকারি চাকরি আইন থাকলেও নতুন করে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস’ নামে আরেকটি আইন করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন আইনটি শুধু বিসিএস কর্মকর্তা, না...

তিন ধরনের নতুন নোট ছাড়লো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

‘বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য’ শীর্ষক ১০০০, ৫০০ ও ১০ টাকা মূল্যমানের নতুন ব্যাংক নোট বাজারে ছাড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (১৮ মে) থেকে এসব...

বিজয় সরণির কলমিলতা বাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে

রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকার কলমিলতা বাজার মার্কেটে ভোরে লাগা অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৫টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হলে...

Recent Comments