Friday, July 3, 2026
Home জাতীয় সরবরাহ লাইনে ছিদ্রের কারণেই ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে গ্যাস

সরবরাহ লাইনে ছিদ্রের কারণেই ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে গ্যাস

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সোমবার (২৪ এপ্রিল) রাতে গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে নগরবাসী। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে চুলা বা অন্যান্য কাজে আগুন না জ্বালাতে প্রচারণা চালানো হয়।

তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে গ্যাসের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাসাবাড়ির সরবরাহ লাইনের ছিদ্র দিয়ে এই গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাসের চাপ কমিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ লাইনের এসব ছিদ্র বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে এক দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রাত ১১টার পরে ঢাকার মগবাজার, ইস্কাটন, রামপুরা, মহাখালী, পূর্ব রাজাবাজার, ক্রিসেন্ট রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বাড্ডা ও হাজারীবাগে গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার খবর আসে।

বিভিন্ন এলাকার মসজিদের মাইক থেকে গ্যাসের চুলা ও দেশলাই না জ্বালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

অনেকে আবার জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে সহায়তা চান।

তবে বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত না হতে আহ্বান জানায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। রাত ১২টার পর এক ফেসবুক পোস্টে মন্ত্রণালয় জানায়, ঈদে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে গ্যাসের চাপ বেড়ে যাওয়ায় (ওভার-ফ্লো) গন্ধ বাইরে আসছে।

এতে আরও বলা হয়, তিতাসের জরুরি ও টেকনিক্যাল টিম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

মন্ত্রণালয়ের এই ফেসবুক পোস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনিও নগরবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করেন।

মঙ্গলবার তিতাসের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কোম্পানিটির জরুরি ও কারিগরি দল রাতেই সমস্যার সমাধান করেছে। এখন আর কোথাও গ্যাসের গন্ধ নেই।

ঢাকার সরবরাহ লাইনের হালচাল

ঢাকার বাসাবাড়িতে তিতাসের গ্যাস সরবরাহের লাইনগুলো ৪০ বছরের পুরোনো। এক দশক আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এসব লাইন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায়ই গ্যাসের সরবরাহ লাইনে ছিদ্র (লিকেজ) পাওয়া যাচ্ছে। অবৈধ সংযোগের কারণেও পাইপলাইনে ছিদ্র তৈরি হয়েছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড সূত্র জানায়, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করে এই প্রতিষ্ঠান। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ সংস্থাও এটি।

ঢাকায় তাদের সাত হাজার কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। তিতাসের আওতাধীন এলাকায় মোট সংযোগ ২৮ লাখ ৭৭ হাজার ৬০৪টি। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ আছে ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩৬টি।

রাজধানী শহরে ১৯৬৭ সালে পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শুরু করে তিতাস। তবে এটি বেশি ছড়ায় ১৯৮০ সালের পর। সেসব পাইপলাইনের মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ১০ বছর পরও ওই পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক কারণেই গ্যাস সরবরাহের লাইনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গ্যাসলাইনে ছিদ্রের কারণে দেড় বছর আগে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণে মারা যান ৩৪ জন।

২০২১ সালের জুনে মগবাজারে একটি ভবনে বিস্ফোরণের পর পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, তিতাসের বিচ্ছিন্ন করা পাইপলাইন সংযোগ থেকে গ্যাস জমে ওই দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

সম্প্রতি সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ও সিদ্দিকবাজারে ভবনের বিস্ফোরণের ঘটনার পরও একই সন্দেহ করছে পুলিশ।

মগবাজার, সায়েন্স ল্যাব ও সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণে মারা গেছেন ৩৯ জন।

সরবরাহ লাইনের ছিদ্র বোঝা যায় যেভাবে

পাইপলাইনে ছিদ্র রয়েছে কি না, তা একধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য পাইপলাইনের ওপর দিয়ে যন্ত্রটি চালিয়ে নেওয়া হয়।

উন্নত দেশগুলোতে গ্যাস পাইপলাইনে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ থাকে। এটিকে বলা হয়, সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন সিস্টেম, যা স্ক্যাডা সিস্টেম নামেও পরিচিত। এতে গ্যাসলাইনের কোথাও ছিদ্র হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়। অনেক দিন ধরে দেশে এই প্রযুক্তি আনার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা শুরু হয়নি।

গত অর্থবছরে ঢাকার ১ হাজার ৬৮২ কিলোমিটার পাইপলাইনের মান কোন পর্যায়ে আছে, তা নিয়ে একটি জরিপ করে তিতাস।

এতে পাইপলাইনের ওপর ৯ হাজার ৯২৬ স্থানে গ্যাসের উৎস (মিথেন) শনাক্ত হয়। যার মধ্যে ৪৫৯টি ছিদ্র ধরা পড়ে। পরে সেগুলো সংস্কার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুরো পাইপলাইন নিয়ে জরিপ করা হলে আরও অনেক ছিদ্র পাওয়া যাবে।

তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, অবৈধ গ্যাস–সংযোগের কারণে সরবরাহ লাইনে ছিদ্র বেশি হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ প্রদানকারীরা লাইনের যত্রতত্র ছিদ্র করে। অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে তিতাস নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।গ্যাস-সংকট বাড়তে থাকায় ২০১০ সালে আবাসিক সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়।মাঝে তা কিছুটা শিথিল করা হলেও ২০১৫ সাল থেকে আবাসিক সংযোগ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ আছে।এ সুযোগে একটি চক্র বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে।

গত দুই বছরে ৩৪০ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাসলাইন উচ্ছেদ করেছে তিতাস। এরপরও থেমে নেই অবৈধ সংযোগ দেওয়া।

এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ মোল্লাহ বলেন, চাহিদার তুলনায় চাপ বেশি থাকায় লাইনের ছোটখাটো ছিদ্র দিয়ে গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। খবর পাওয়া মাত্র তিতাসের ১৪টি দল ঘটনাস্থলে যায়। গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণে এনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। বড় কোনো ছিদ্র পাওয়া যায়নি। সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্ভয়ে রান্নাবান্না করতে পারেন।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অর্থ এই নয় যে আশঙ্কামুক্ত। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত যে শহরবাসী প্রতিনিয়ত গ্যাসের ঝুঁকির মধ্যেই আছে। বিতরণ লাইনগুলো নিয়ম মেনে সময়ে-সময়ে তদারকি করার কথা থাকলেও তিতাস তা করছে না। ভোক্তাদের জীবন তিতাসের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, তিতাসের সঞ্চালন লাইনে যে ত্রুটি আছে, এ ঘটনায় তা আবার নতুন করে প্রমাণিত হলো। আবাসিক এলাকাগুলো ভয়ানক ঝুঁকিতে আছে। গতকাল বিভিন্ন জায়গায় গ্যাস বের হয়ে গেছে। এই গ্যাস কোথাও জমা থাকলে আবারও সমস্যা হতে পারে। তাই এটা বলা যাবে না যে ঝুঁকি শেষ হয়েছে। তিতাসের সঞ্চালন লাইনগুলো মেরামত শুধু নয়, নতুন লাইন বসাতে হবে।

গ্যাসের পাইপলাইনে ছিদ্র বা গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনায় নগরবাসীর করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে ইয়াসির আরাফাত বলেন, বাসাবাড়িতে গ্যাস জমা না থাকলে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা কম। দরজা-জানালা খোলা রেখে তারপর চুলা জ্বালাতে হবে। রান্নাঘরের দরজা-জানালা খোলা রাখলে গ্যাস ছড়ালেও তা সরে যেতে পারে। অর্থাৎ সেখানে ঝুঁকি কম থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান

চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া সফর শেষে দেশে ফিরেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। শুক্রবার (৩ জুলাই) তিনি দেশে ফেরেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ...

ফ্যামিলি কার্ডে বদলাচ্ছে নারীদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা: পানিসম্পদ মন্ত্রী

পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের...

ইউরোপে নতুন ওষুধ বাজারজাতের অনুমোদন পেল রেনাটা

ওষুধ খাতের কোম্পানি রেনাটা পিএলসি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ছয়টি দেশে লেভোথাইরক্সিন সোডিয়াম ট্যাবলেট বাজারজাতের অনুমোদন পেয়েছে। ইইউর বিকেন্দ্রীকৃত অনুমোদন প্রক্রিয়ার (ডিসেন্ট্রালাইজড প্রসিডিউর-ডিসিপি) আওতায় আয়ারল্যান্ড, জার্মানি,...

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন চুক্তি

ক্লাস্টারভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির মধ্যে একটি পুনঃঅর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল এ তথ্য...

Recent Comments