দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ প্রবণতা বাড়লেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক পুলিশ সদস্য এখনো বিভিন্ন অপতৎপরতায় লিপ্ত, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে একদলীয় নিয়োগের ফলে অনেক অযোগ্য ও পক্ষপাতদুষ্ট সদস্য ঢুকে পড়ে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর সহিংস দমননীতিতে যুক্ত এসব সদস্যদের ভূমিকা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও পুলিশের একটি অংশ এখনো নিষ্ক্রিয় বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, “বাহিনীর ওপর দিয়ে বড় ধকল গেছে। এতে কিছু সদস্য নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে, তবে ঊর্ধ্বতনরা এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেবেন।”একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক পুলিশ সদস্য এখনো ছদ্মবেশে নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীরা পুলিশ ভীতি হারিয়ে ফেলেছে, ফলে তারা আগের চেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৫ মাসে সারা দেশে ৭১টি ডাকাতি, ১৭১টি ছিনতাই, ২৯৪টি খুন এবং ১০৫টি অপহরণের মামলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায়ই ঘটেছে ৮টি ডাকাতি, ৫৪টি ছিনতাই, ৩৬টি খুন ও ৩১টি অপহরণের ঘটনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অপরাধীরা যতটা সক্রিয়, পুলিশ ততটাই নিষ্ক্রিয়। পুলিশ সক্রিয় না হওয়ার কারণ বাহিনীকেই স্পষ্ট করতে হবে।” অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চালু করেছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকলেও এখনো বড় পরিবর্তন আসেনি। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়, তবেই এই অভিযান সফল হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে গ্যাং কালচার ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কিশোর অপরাধীরা সংঘবদ্ধ হয়ে ছিনতাই ও ডাকাতিতে যুক্ত হচ্ছে। পুলিশের অপর্যাপ্ত টহল ও অস্ত্রের দুর্বলতাও অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে তুলছে।হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানান, “দূরপাল্লার বাসে ডাকাতি বন্ধে আমরা নতুন ব্যবস্থা নিয়েছি, কিন্তু সীমিত জনবল থাকায় সব জায়গায় নজরদারি করা কঠিন।”
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া পক্ষপাতদুষ্ট পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও বাহিনীর ভেতরের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


