ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে তাকালে বিজেপির গেরুয়া রঙের বিস্তার স্পষ্ট। পশ্চিমে গুজরাট–রাজস্থান থেকে উত্তর ও পূর্ব ভারতে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার হয়ে আসাম পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিজেপির উপস্থিতি চোখে পড়ে। তবে এই ধারাবাহিকতার মাঝখানে একটি ব্যতিক্রম—পশ্চিমবঙ্গ। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনাধীন এই রাজ্যটি বিজেপির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ এখন বিজেপির ‘সম্মান রক্ষার’ লড়াইয়ের কেন্দ্রে। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ২১৫ আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফেরে, আর বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। পরাজয়ের পরও রাজ্যটিতে সংগঠন বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টা থামায়নি বিজেপি।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বামফ্রন্টকে হারিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসে। টানা প্রায় দেড় দশক শাসনের ফলে দলটি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা অর্জন করেছে। অন্যদিকে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মাধ্যমে ভোটব্যাংক গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছে। ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর ধারণা তুলে ধরে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা।
বিজেপির কৌশলের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাংস্কৃতিক রাজনীতি। রামনবমীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবকে রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান করা, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানকে জনজীবনে প্রতিষ্ঠা করা এবং হিন্দু ভোট একত্র করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণ’-এর অভিযোগ তুলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চায় দলটি।
সম্প্রতি বিহারে বিজেপি-জোটের বড় সাফল্য পশ্চিমবঙ্গের নেতাকর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলার সাংস্কৃতিক আইকনদের সামনে এনে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ ও ‘বন্দে মাতরম’ গানকে ঘিরে উদ্যোগ তারই অংশ।
তবে এই কৌশলেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সংসদে বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন, মাস্টারদা সূর্যসেনের নাম সংক্ষেপে উল্লেখ—এসব নিয়ে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মোদি। তৃণমূল ও কংগ্রেসের মতে, বাংলার মনীষীদের নাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেই বারবার ভুল করছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটযুদ্ধে বিজেপির সামনে শুধু সাংগঠনিক নয়, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার পরীক্ষাও রয়েছে। বাংলার মন জয় করতে গিয়ে সেই সংবেদনশীলতায় হোঁচটই এখন বিজেপির সবচেয়ে বড় বাধা।


