নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতি, নীতিনির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন।
বিগত বছরগুলোয় রাষ্ট্রের সঙ্গে বেসরকারি খাতের দূরত্ব ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। সে দূরত্ব কমাতে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও প্রকৃত সক্ষমতা মূল্যায়নে ফরেনসিক অডিট হওয়া দরকার বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা গত চার-পাঁচ বছর নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছি। কভিড-১৯ মহামারী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দেশকে সামাল দিয়েছে—এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। তারা হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে, দ্রুত কার্যক্রম চালিয়েছে এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় কিছু উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবে এখানে একটি বড় সতর্কতার জায়গা আছে। আমরা যেন আবার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মানসিকতায় আটকে না যাই। সংকট মোকাবেলা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু নীতিনির্ধারণে যদি শুধু স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় আটকে যাই, তাহলে সেটি বড় সমস্যা হবে। এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কাঠামোগত রূপান্তর।’
দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ফরেনসিক অডিটের গুরুত্ব তুলে ধরেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের সেবা নিশ্চিত করতে গেলে প্রথমে জানতে হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কী। বাস্তবতা হলো অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই আর্থিকভাবে খুবই দুর্বল। যখন যুদ্ধ বা সংকট হয়, তখন সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর। তারা ঠিকভাবে সেবা দিতে পারবে কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এটা খুব বড় কাজ নয়; ২০-৩০টি প্রতিষ্ঠানের ফরেনসিক অডিট করলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বলা হয়েছিল একটি শ্বেতপত্র হয়েছে, অনেক বড় বড় অংকের টাকা পাচারের কথা এসেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত বড় প্রতিষ্ঠানের ফরেনসিক অডিট হয়নি।’
অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর রিয়াজ। তিনি তার উপস্থাপনায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সাতটি অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র তুলে ধরেন। এগুলো হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, আর্থিক খাতে সুশাসন, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ ও প্রতিযোগিতামূলক করা, বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘অনেক বিষয়ের মধ্যে আমরা দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করার জন্য সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছি। সরকারের উচিত সেগুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যেই সংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনা করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘গত দুই দশকে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের যাত্রা অতিক্রম করেছে তা সত্যিই উল্লেখযোগ্য। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছি। রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকে উন্নতি হয়েছে। এ অগ্রযাত্রার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শ্রম-নিবিড় উৎপাদন, রেমিট্যান্স এবং অভ্যন্তরীণ বাজার। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে আমাদের অর্থনীতি একটি জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সাপ্লাই চেইনে বিঘ্ন এবং কঠোর বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির মতো বাহ্যিক ধাক্কার সঙ্গে আমাদের কিছু অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও যুক্ত হয়েছে। যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক অবস্থা ও কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। আমরা দেখছি যে ব্যালান্স অব পেমেন্টের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে এবং মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে কমছে। কিন্তু আমাদের পুনরুদ্ধার ভঙ্গুর, বিনিয়োগের গতি কম ও ক্রেডিট প্রবৃদ্ধি দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয় এসেছে ডিমান্ড কমপ্রেশনের মাধ্যমে—প্রডাক্টিভিটিনির্ভর সম্প্রসারণের মাধ্যমে নয়।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম, সাবেক সভাপতি ও অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) গ্রুপের চেয়ারম্যান এম আনিস উদ দৌলাসহ সংগঠনটির সদস্য এবং ব্যবসায়ীরা।


