১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যের মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন ও জনমত গড়ে তুলতে সেখানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিদেশের মাটিতে থেকেও জন্মভূমির স্বাধীনতার জন্য কাজ করা ড. ইউনূসের অবদান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দেন ড. ইউনূস। তিনি তহবিল সংগ্রহ, স্থানীয় প্রশাসন এবং জাতিসংঘের কূটনীতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করেন। তার বাড়ি থেকে প্রকাশিত হতো বাংলাদেশ নিউজলেটার, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
তিনি বাংলাদেশ নাগরিক সমিতি গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার চালান। এই সমিতি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করে মুক্তিযুদ্ধের খবর বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। সমিতির সদস্যরা নিজেদের বেতনের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের কাজে তহবিল হিসেবে দান করার সিদ্ধান্ত নেন।
ড. ইউনূস মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচারের জন্য মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। ন্যাশভিলে স্থানীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মার্কিন নাগরিকদের পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে তাদের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
ড. ইউনূস এবং তার সহকর্মীরা বিভিন্ন দূতাবাসে গিয়ে রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালান। এছাড়া তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রবাসী বাঙালিদের বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করেন, যা মার্কিন আইন প্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
ড. ইউনূস তার আত্মজীবনী গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবনএ মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি লেখেন, “আমি নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলাম।” এ ঘোষণার পরই প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর ড. ইউনূস দেশে ফিরে আসেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে ব্রতী হন। প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ ব্যাংক। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে কাজ করা গ্রামীণ ব্যাংক বর্তমানে এক কোটি ৬ লাখ সদস্যের একটি সফল প্রতিষ্ঠান।
ড. ইউনূস সব সময় সমাজ পরিবর্তন ও মানবসেবার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার কর্মকাণ্ড এই দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি উদাহরণ। তিনি যেমন স্বাধীনতার সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি দারিদ্র্য বিমোচনে তার অবদানও অনন্য। . ইউনূসের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। দেশের স্বাধীনতার জন্য যেমন তিনি লড়াই করেছেন, তেমনি স্বাধীনতার পরও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন।


