বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম তার সম্পদ জব্দ এবং বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাইফুল আলমের দাবি, শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার তার ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে ২০০৪ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এস আলম এই আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে চান। তার আইনজীবীরা ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ছয় মাসের মধ্যে সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। সমাধান না হলে তারা ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইফুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা ২০১১ সালে সিঙ্গাপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ২০২১-২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ২০২০ সালে তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছিলেন, এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার করেছে। এ কারণে তাদের ১২৫টি ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এই আইনি উদ্যোগ মূলত পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টির জন্য নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তিতে সালিশি আদালতের প্রভিশন থাকলে এস আলম গ্রুপ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশ সরকার যদি সেখানে অংশ না নেয়, আদালত একতরফা রায় দিতে পারে। এটি দেশের জন্য প্রতিকূল হতে পারে। তবে সরকার সেখানে উপস্থিত হয়ে এস আলমের বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগগুলো তুলে ধরতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, “আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায় মানা বাধ্যতামূলক নয়। যদি রায় বাংলাদেশের বিপক্ষে যায় এবং সরকার তা বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানায়, তাতে কার্যত কোনো বড় ক্ষতি হবে না।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এস আলমের এই পদক্ষেপ দেশের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে। তবে সরকারের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এস আলমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরা। এস আলমের সালিশি আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সঠিক আইনি কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এই বিতর্ককে দেশের পক্ষে একটি ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।


