আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট যেন শাস্তিমূলক না হয়ে সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমূলক হয়— সে প্রত্যাশা জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান। একইসঙ্গে বাজেটে ১০০ বা ১০০০ টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’-এর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বেসরকারী খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে আজ এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন এমসিসিআই সভাপতি। সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে এমসিসিআই ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ।
এসময় ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরেন এমসিসিআই সভাপতি। প্রথমত এনআইডি ও টিআইএন ডাটাবেজ পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূতকরণ। নতুন করদাতাদের ভীতি দূর করতে বছরে ১০০ বা ১০০০ টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজ রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা।
তৃতীয়ত করপোরেট কর কমানো হলেও ‘নগদ লেনদেনের’ কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাচ্ছে না। অর্থনীতির বাস্তবতার নিরিখে শর্তটি বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছে আরো বলা হয়, একইসঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আরো ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে।
চতুর্থত ৩৯টি ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক থাকা ব্যবসা সহজীকরণের অন্তরায়। এছাড়া আয়কর আইন ২০২৩-এর কিছু ধারা (যেমন ৬ বছরের অধিককাল সম্পদ বিবেচনা) বাস্তব অবস্থার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
পঞ্চমত ভ্যাট ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে। এমসিসিআই বলছে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষায় মুসক ৪.৩ ফরমে ‘মূল্যমান’-এর পরিবর্তে শুধু ‘পরিমাণ’ উল্লেখ করার সুযোগ দেয়া হোক। কাস্টমস পর্যায়ে ডাটাবেজ মূল্যের পরিবর্তে প্রকৃত ‘লেনদেন মূল্য’ অনুযায়ী শুল্কায়ন নিশ্চিত এবং অটোমেশন প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি।
সর্বশেষ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)। খাতটির বিকাশে পৃথক করহার ও ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হলে দেশীয় শিল্প আরো শক্তিশালী হবে।
সেমিনারে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আখতার মালা বলেন, আমাদের জন্য বর্তমান সময়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। জ্বালানি সংকট রয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সংশ্লিষ্ট আলোচনা চলছে, বিনিয়োগ পরিস্থিতি দুর্বল ও কম রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। অন্যদিকে, আগামী অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু যখনই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়, তখন বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। একই পকেট থেকে সর্বোচ্চ কর আদায়ের প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হন এবং নতুন করদাতারা কর নেটের বাইরে থেকে যেতে চান।
তিনি আরো বলেন, কর প্রশাসনে বিবেচনাধিকার কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তা বাড়ছে, যা করদাতাদের জন্য হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ দেশের বিপুলসংখ্যক সম্পদধারী মানুষ এখনো করের আওতার বাইরে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে কী কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। ২০০৯ সাল থেকে আমরা ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস চালুর কথা শুনছি, কিন্তু ১৫-১৬ বছরেও এর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায় না—কেন এগোচ্ছে না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
তিনি ডাটা ট্রান্সপারেন্সির নিশ্চিতের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বাজেট প্রসঙ্গে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো ডাটা ট্রান্সপারেন্সি বা তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বা অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা চাই, সরকার যে তথ্য প্রকাশ করবে তা যেন নির্ভুল, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়। এছাড়া কর কাঠামোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অল্প কিছু খাত থেকে সরকার মূল রাজস্ব পায়। যেমন মোবাইল খাত। কিন্তু ইনফরমাল সেক্টরে যে বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রম রয়েছে, সেখান থেকে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি নেই। করদাতাদের আস্থা তখনই বাড়বে, যখন তারা বিশ্বাস করবে যে তাদের দেওয়া কর জনস্বার্থে সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যদি দেখা যায়, সেই অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে সম্পদ গড়তে ব্যবহৃত হচ্ছে—লন্ডন, সিঙ্গাপুর বা অন্যান্য স্থানে। তাহলে করদাতাদের আস্থা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
ইআরএফ সভাপতি বলেন, এ কারণে ট্যাক্সপেয়ার কনফিডেন্স পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে প্রাইভেট সেক্টরের আস্থা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। কর কাঠামোয় আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডাইরেক্ট ও ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সের ভারসাম্য। সরকার সরাসরি কর বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সের উপাদান সরাসরি করের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং মূলধনের সংকট তৈরি হচ্ছে।
দৌলত আখতার মালা আরো বলেন, ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেমের বিষয়টি উল্লেখ করা জরুরি। ব্যাংক, কর অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে একই আর্থিক বিবরণীর ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ জমা দেয়ার সমস্যা দূর করতে একটি সমন্বিত সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি এখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। কেন হয়নি, সেটিরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা আমরা জানতে চাই। সার্বিকভাবে, আমরা আশা করি সরকার এসব বিষয় নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা উপস্থাপন করবে।
সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বাংলাদেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি শাহাদাত হোসেনসহ এমসিসিআই ও ইআরএফের সদস্য এবং বেসরকারী খাতের প্রতিনিধিরা।


