দেশের ব্যাংক খাত এখন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও মূলধন ঘাটতি, কোথাও খেলাপি ঋণের চাপ, আবার কোথাও তারল্য সংকট—সব মিলিয়ে এ খাতের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটেও শক্তিশালী মূলধন কাঠামো ও আর্থিক ভিত্তি তুলে ধরতে পেরেছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। বেসরকারি ব্যাংকটি দেখিয়ে দিয়েছে শক্তিশালী কমপ্লায়েন্স, টেকসই ব্যাংকিং কাঠামো এবং বাণিজ্যিক সাফল্য পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য ন্যূনতম সিআরএআর (ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ) ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। সে হিসেবে প্রাইম ব্যাংকের অবস্থান নিয়ন্ত্রক সীমার চেয়ে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকটির হাতে অতিরিক্ত মূলধন সুরক্ষা রয়েছে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঋণঝুঁকি মোকাবেলা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ প্রসঙ্গে প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এম নাজিম এ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত তিন দশকে নির্ভরতা, স্থিতিশীলতা ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রাইম ব্যাংক দেশের ব্যাংক খাতে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি, ‘এএএ’ ক্রেডিট রেটিং, ধারাবাহিক মুনাফা, উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেছি। প্রায় ১০ লাখ গ্রাহকের সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমানে আমাদের রয়েছে দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক।’
প্রাইম ব্যাংকের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকায়। আর গ্রাহকদের আমানত জমা রয়েছে ৪৪ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ১৯ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে ব্যাংকটি, যার প্রায় সবই সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড। তারল্য সংকটের কারণে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকই উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। তবে এক্ষেত্রেও প্রাইম ব্যাংক বেশ স্বস্তিতে রয়েছে। গত বছর শেষে ব্যাংকটির আমানত সংগ্রহ ব্যয় (কস্ট অব ডিপোজিট) ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার এখন ৩০ শতাংশেরও বেশি। কোনো কোনো ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেছে। তবে এক্ষেত্রে একেবারেই নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক। গত বছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। খেলাপি কম হওয়ায় প্রাইম ব্যাংকের মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি পরিচালন মুনাফা করেছে ১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১০ কোটি টাকা নিট মুনাফায় নিতে পেরেছে।
প্রাইম ব্যাংকের সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুগত্যকে কেবল বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়; বরং ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এরই স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সাসটেইনেবিলিটি রেটিং ২০২৪’ অর্জন করে ব্যাংকটি। সবুজ অর্থায়ন, টেকসই ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং সুশাসন কাঠামোয় ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য এ স্বীকৃতি দেয়া হয়। পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিং কার্যক্রমে গুরুত্ব বাড়ার এ সময়ে এমন স্বীকৃতি প্রাইম ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতাকে আরো শক্তিশালী করেছে।
শুধু তা-ই নয়; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নথিপত্র ডিজিটালাইজেশনেও অগ্রণী ভূমিকা রাখছে প্রাইম ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এফই সার্কুলার ৬ অনুযায়ী চালু হওয়া ‘গ্রিন এলসি’ কাঠামোর আওতায় ইলেকট্রনিক এলসি প্রসেসিংয়ে দ্রুত অভিযোজন ঘটিয়েছে ব্যাংকটি। এমনকি এ কাঠামোর আওতায় লাইভ ট্রানজেকশন সম্পন্নকারী প্রথমদিকের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ছিল প্রাইম ব্যাংক। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক ব্যাংকিং কার্যক্রমেও নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাইম ব্যাংক এএমডি এম নাজিম এ চৌধুরীর ভাষ্য, গ্রাহককেন্দ্রিক সেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রাইম ব্যাংক ‘মাইপ্রাইম’, ‘প্রাইমপে’ ও ‘প্রাইম বাণিজ্য’-এর মতো আধুনিক ডিজিটাল প্লাটফর্ম চালু করেছে, যা ব্যাংকিং সেবাকে আরো সহজ, দ্রুত ও স্মার্ট করেছে। তিনি বলেন, ‘এখন যেকোনো স্থান থেকে, যেকোনো সময়ে প্রাইম ব্যাংকের সেবা গ্রহণ করা সম্ভব। পাশাপাশি ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ কল সেন্টার সার্ভিস’, ‘প্রাইম একাডেমিয়া’ এবং ‘হোম লোন সার্ভিস’-এর মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও সৃজনশীল ব্যাংকিংয়ের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। গ্রিন ব্যাংকিং, সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো আধুনিক, টেকসই ও গ্রাহকবান্ধব ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের অঙ্গীকার।’


