দেশের ভোগ্যপণ্য খাতের সবচেয়ে বড় বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রায় ছয় দশক আগে কোম্পানিটি এ দেশে ব্যবসা শুরু করে। বিশ্বের ১৯০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে ব্যবসা করলেও ইউনিলিভারের সবচেয়ে বড় বাজার এশিয়া ও আফ্রিকা। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাবে বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে গত বছর তাদের পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। এতে টাকার অংকে ইউনিলিভার বাংলাদেশের আয় বাড়লেও কমে যায় বিক্রির পরিমাণ। তাই পরে দাম কিছুটা কমাতে বাধ্য হয় বহুজাতিক কোম্পানিটি।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ব্যবসা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয় বেড়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে আয় ছিল ৫ হাজার ১২০ কোটি টাকা। এর পরের বছর ২০২১ সালে আয় কিছুটা কমে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২২ সালে কোম্পানিটির আয় বেড়ে ৫ হাজার ৭০৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ইউনিলিভার বাংলাদেশের আয় বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। অবশ্য আয় বাড়লেও করপূর্ব মুনাফার পরিমাণ তিন বছরের ব্যবধানে কিছুটা কমেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির করপূর্ব মুনাফা ছিল ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। এর পরের বছর ২০২১ সালে এটি বেড়ে ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২২ সালে কোম্পানিটির করপূর্ব মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।
কর পরিশোধ ও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয়ার পর মুনাফার যে অংশ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সঞ্চিত রাখা হয় সেটি সংরক্ষিত আয় হিসেবে পরিচিত। গত তিন বছরে ইউনিলিভার বাংলাদেশের সংরক্ষিত আয় বেড়েছে তিন গুণ। এর মধ্যে ২০২০ সালে কোম্পানিটির সংরক্ষিত আয় ছিল ২২৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ২০২১ সালে এটি বেড়ে ৪০৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২২ সাল শেষে সংরক্ষিত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকায়। ২০২০-২২ সালের মধ্যে কভিড-১৯-এর অভিঘাত এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে দেশের সৃষ্ট বাহ্যিক ঝুঁকির কারণে দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে পড়েছে। তবে এ সংকটের মধ্যেও ব্যবসা ও মুনাফায় খুব বেশি উত্থান-পতন হয়নি ইউনিলিভার বাংলাদেশের। আয়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কোম্পানিটির করপূর্ব মুনাফা কিছুটা কমেছে এ সময়।
২০২২ সাল শেষে বৈশ্বিকভাবে ইউনিলিভারের ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্স বেশ ভালো ছিল। বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাড়তি খরচ সামাল দিতে বৈশ্বিক পরিসরে কোম্পানিটি পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে ইউনিলিভার বৈশ্বিকভাবে ৬০ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরো আয় করেছে। আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে এ সময়ে পণ্যের দাম ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে অবশ্য পণ্য বিক্রির পরিমাণে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আগের বছরের তুলনায় ২০২২ সালে বৈশ্বিকভাবে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ১ শতাংশ।
উদীয়মান বাজারগুলোয় ২০২২ সালে ইউনিলিভারের বিক্রি বেড়েছে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে দাম বাড়ানোর প্রভাব ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এ সময়ে উদীয়মান বাজারে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমেছে ২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে পণ্যের দাম ও পরিমাণ দুটোই বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে লাতিন আমেরিকার বাজারে পণ্যের দাম বেশ বাড়াতে হয়েছে এবং এতে বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে। অতিমারী-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে চীনের বাজারে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে মূল্যের দিক দিয়ে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বিক্রির পরিমাণ অপরিবর্তিত ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে তুরস্কের বাজারে পণ্য বিক্রির পরিমাণে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। উন্নত দেশের বাজারে বিক্রি প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে মূল্য ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ার বিপরীতে বিক্রির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে মূল্য বাড়ানোর প্রভাবে বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে ইউনিলিভারের।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের পণ্যের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে লাক্স, লাইফবয়, ফেয়ার অ্যান্ড গ্লো, পন্ডস, ক্লোজ আপ, পেপসোডেন্ট, সানসিল্ক, ডাব, ক্লিয়ার, হুইল, সার্ফ এক্সেল, রিন ও ভিম। সাবান, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, লোশন, বিউটি ক্রিম ও টুথপেস্ট থেকে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশ আয় আসে। ডিটারজেন্ট, টয়লেট ক্লিনার ও অন্যান্য ক্লিনিং পণ্য থেকে আসে ৩৬ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য পণ্য থেকে আয়ের ৮ শতাংশ আসে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাবে তারা বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। অবশ্য সিদ্ধান্ত নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি। কিছুটা সময় অপেক্ষা করে বাজারে থাকা পুরনো পণ্য বিক্রি হওয়ার পর তাদের বর্ধিত দামের পণ্য বাজারে ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু বর্ধিত দামের পণ্য যখন বাজারে আসতে শুরু করেছে তখন দেশের মূল্যস্ফীতির পারদ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কিনতে ভোক্তারা হিমশিম খেতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় তাদের পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমতে থাকে। ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির সময় বাড়তি দামের বিষয়টি ভোক্তাদের ইউনিলিভারের পণ্য কেনা কমিয়ে দিতে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে বিউটি ক্রিম থেকে ইউনিলিভারের যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয় আসে সেটির বিক্রি কমে গেছে। ফেসওয়াশ বিক্রি কমে গেছে। কন্ডিশনার বিক্রি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমেছে। দাম বাড়ানোর কারণে দেখা গেছে ইউনিলিভারের একই ক্যাটাগরির পণ্যের মধ্যেই তুলনামূলক কম দামেরটি বেছে নিচ্ছে ভোক্তারা। অবশ্য মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়ার কারণে বেশকিছু পণ্যের দাম পরবর্তী সময়ে কমিয়েছে কোম্পানিটি।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের পণ্যের বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও কথা বলেছে বণিক বার্তা। তারা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইউনিলিভারের পণ্য বিক্রির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে ইউনিলিভার দাম বাড়ানোর পর প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোও তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভোক্তাদের মধ্যে ইউনিলিভারের পণ্যের পরিবর্তে কম দামি অন্যান্য ব্র্যান্ডের পণ্যের প্রতি সেভাবে ঝুঁকতে দেখা যায়নি। সুপারস্টোরগুলোতেও কসমেটিকস পণ্য বিক্রি কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইউনিলিভার বাংলাদেশ বলছে, অতিমারী ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রীত পণ্যের ক্যাটাগরি মিশ্রণে পরিবর্তন হয়েছে। অন্যদিকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যয় বাড়ায় অবধারিতভাবে উৎপাদিত পণ্যেরও দাম বেড়েছে। এতে পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের কারণে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
এসব সংকট সামাল দিয়ে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে ইউনিলিভার তাদের পোর্টফোলিও, ক্যাটাগরি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও ভৌগোলিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দিয়েছে। যখনই বাহ্যিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে তখনই তারা তাদের ব্যবসা পর্যালোচনা করে সম্পদ ও প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূতকরণের মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় কাজে লাগিয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের আয়ের ৯৫ শতাংশই আসে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে। ফলে তাদের কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠানটি সার্ভিস ডেলিভারি মডেল সাজিয়েছে।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাভেদ আখতার বলেন, ‘সক্রিয় কৌশল নেয়া সত্ত্বেও আমরা ব্যবসায় বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়তে দেখেছি। কভিডের সময়ে আমাদের কিছু পণ্যের মিশ্রণে পরিবর্তন হয়েছে। যেমন সে সময় সাবানের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এর বিপরীতে ময়েশ্চারাইজার, লোশন, ডিটারজেন্ট ও চায়ের মতো পণ্যের চাহিদা কমে যায়। মানুষ ঘরের বাইরে কম যাওয়ার কারণে পণ্য বিক্রির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। এতে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে আমাদের বিক্রির পরিমাণ ও মার্জিনে প্রভাব পড়েছে। যখন আমাদের আয় একটি পর্যায়ে যাচ্ছিল তখন আমাদের পণ্য বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি কমে দুই অংকে দাঁড়িয়েছে। এটি আমাদের অনিবার্য ব্যয় ও কোম্পানির মুনাফাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং মার্জিন ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।’
কভিড ও সাম্প্রতিক সংকটের সময় ইউনিলিভার বাংলাদেশ তার কৌশলের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে উল্লেখ করে জাভেদ আখতার বলেন, ‘এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে আমরা ভোক্তা ও গ্রাহকদের সেবা দেয়ার পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবসায়িক মডেলকে সুরক্ষিত করছি। অত্যন্ত বিধ্বস্ত পরিবেশ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে আরো টেকসই হিসেবে ভবিষ্যতে টিকে থাকার জন্য আমরা নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখলেও মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এখানে আমরা ৬০ বছর ধরে ব্যবসা করছি এবং ভবিষ্যতে আরো দীর্ঘ সময় ধরে তা অব্যাহত রাখতে চাই।’
বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ইউনিলিভারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। বর্তমানে কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। কোম্পানিটিতে ইউনিলিভারের মূল কোম্পানি ইউনিলিভার পিএলসির ৬১ শতাংশ এবং বাংলাদেশ সরকারের ৩৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।


