নাসা গ্রুপের ৮ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ মাত্র ১% এককালীন জমা বা ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যাতে প্রতিষ্ঠানটির কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা যায়। তবে বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ইউনিটগুলো চালুর বিষয়ে জটিলতা রয়ে গেছে, কারণ জনতা ব্যাংক — যার কাছে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ ২৩ হাজার কোটি টাকা — কোনো ডাউন পেমেন্ট ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলে রাজি হয়নি।
অবশ্য বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে রিং ফেনসিং নিশ্চিত করে সকল আয় একটি নির্দিষ্ট এসক্রো একাউন্টে জমা করার শর্তে এবং ১০০ শতাংশ মার্জিন দেওয়া সাপেক্ষে কোম্পানিগুলোর এলসি খুলবে ব্যাংকগুলো। গতকাল মঙ্গলবার শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘বেক্সিমকো শিল্পপার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি’র সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, বিজিএমইএ’র সভাপতিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে তহবিল সংকটে নাসার সব তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ রয়েছে, বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক।
সাইফুল আলম আরও বলেন, ”আমরা এই শর্ত মেনে নিয়েছি। আমরা আমাদের গ্রুপের জমি বিক্রি করে যত দ্রুত সম্ভব ডাউন পেমেন্টের টাকা ব্যাংকগুলোতে জমা দেব”- জানান তিনি।
সূত্র জানায়, নাসা গ্রুপ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ২২টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৮ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা খেলাপি। এই ঋণের ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে নাসা গ্রুপকে, এতে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা লাগবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, নাসা গ্রুপের ঋণ ও বেতন সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারেন, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট জব্দ করাসহ বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নজরুলকে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলায় বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তবে নাসা গ্রুপকে রক্ষায় এখনো তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন নাসা গ্রুপের প্রতিনিধিদের সতর্ক করে বলেন, কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা না হলে নাসা গ্রুপের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “সরকারি প্রতিনিধি ও নাসা গ্রুপের কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল, যেখানে সিনিয়র সেনা কর্মকর্তারাও থাকবেন, শিগগিরই কারাবন্দি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সেখানে তার কাছ থেকে সম্পদ বিক্রির জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়া হবে।”
উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। টিবিএসকে তিনি বলেন, নাসা গ্রুপের বন্ধ কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হলেও – বেক্সিমকো টেক্সটাইলভুক্ত কারখানাগুলো নিয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় বন্ধ থাকা বেক্সিমকো টেক্সটাইলভুক্ত কারখানাগুলো চালু করার বিষয়ে বিস্তারিত কোন আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন সভায় উপস্থিত শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা।
বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের ২৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সেই পাওনা জনতা ব্যাংক কিভাবে ফেরত পাবে এটি মূল কনসার্ন। জাপানের রিভাইভাল প্রজেক্ট লিমিটেড, জনতা ব্যাংক এবং বেক্সিমকো গ্রুপের একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে কারখানাগুলো খোলা হতে পারে, তবে ওই চুক্তিতে এই পাওনা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করতে চায় জনতা ব্যাংক। কিন্তু জাপানি প্রতিষ্ঠানটি এতে রাজী নয়। পুরনো ঋণের দায়ভার নিতে আগ্রহী নয় রিভাইভাল। কারখানাগুলো চালু করতে এখন যে ৪০০ কোটি টাকার মূলধন ঋণ নেবে তারা, শুধু এই ঋণ পরিশোধের দায়ভার নিতে আগ্রহী রিভাইভাল।
জনতা ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বেক্সিমকো গ্রুপ জনতা ব্যাংকে থাকা তাদের ২৩ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ডাউন পেমেন্ট ছাড়া পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করে নিতে চাচ্ছে। জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট তাদের এ প্রস্তাবে রাজি নয়। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে অনাপত্তি দেবে না বলে মৌখিকভাবে জানিয়েছে।
তিনি বলেন, “জনতা ব্যাংক বর্তমানে চরমভাবে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের অভাবে ভুগছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে (বেক্সিমকো) ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।”
বেক্সিমকো টেক্সটাইলের ঊধর্বতন কর্মকর্তারা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, গত বছর ৫ আগস্টের আগে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জনতা ব্যাংককে ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেন তারা। তখন জনতা ব্যাংকের বোর্ড ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাব পাস করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরই মধ্যে হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকের নতুন বোর্ড ওই প্রস্তাব বাতিল করে ৫০০ কোটি টাকা আদায় দেখিয়েছে ঋণের বিপরীতে। ওই টাকা এখন ডাউনপেমেন্ট হিসেবে দেখাতে বলছে বেক্সিমকো গ্রুপ, তাতে রাজী নয় জনতা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রিভাইভাল যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, তাতে নতুন ব্যবসা থেকে জনতা ব্যাংকের কাছে টাকা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ রিভাইভালের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে ব্যাক টু ব্যাক এলসি হবে। পেমেন্টও হবে বিদেশে।রিভাইভাল এক্সপোর্ট প্রসিড (রপ্তানি আয়) থেকে ৮ শতাংশ কমিশন নেওয়ার প্রস্তাব করেছে। ব্যাক টু ব্যাক এলসির পাওনা মেটানোর পর যে অর্থ থাকবে, তা প্রথমে ব্যয় হবে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে। এরপর বিদ্যুৎ, পানির বিলসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় করা হবে। এরপর কোনো অর্থ থাকলে জনতা ব্যাংক পাবে। ফলে রিভাইভাল যে এলসির কথা বলছে, তার আওতায় জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম।
বেক্সিমকো টেক্সটাইলের বন্ধ থাকা প্রায় ১৪টি কারখানা চালু করতে জাপানি প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল প্রজেক্ট লিমিটেড ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। এর প্রেক্ষিতে কারখানাগুলো চালুর এই উদ্যোগে সহায়তা দিতে ঋণদাতা ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করে শ্রম মন্ত্রণালয়।


