রমজানের শুরুতে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। ফলে পণ্যের দাম ছিল নাগালের মধ্যে। কিন্তু রমজানের মাঝামাঝি থেকে বাড়তে শুরু করে চালের দাম। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মানভেদে চালের দাম বেড়েছে ৭-১২ টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৫ টাকা। সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে প্রায় আট লাখ টন। আমদানির পরেও কমছে না চালের দাম।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টন।
যদিও চলতি অর্থবছরে সরকারিভাবে চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ টন। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে মাত্র তিন লাখ টন। সব মিলিয়ে চাল আমদানি হয়েছে আট লাখ টন।
ফলে চাল আমদানি লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। যদিও অর্থবছরের মাত্র তিন মাস বাকি আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের চালের বর্তমান মজুদ বেশ কম। আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে যে হারে চালের আমদানি করা প্রয়োজন ছিল, সেটি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি এই সময়ে চালের দাম কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে কম উৎপাদন ও আমদানির সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বড় মিলারদের বিরুদ্ধে বাজারে চালের কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দর অস্থিতিশীল করে তোলার অভিযোগ রয়েছে। আবার সরকারের তদারকি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যথাযথ তদারকির অভাবে আড়তদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। এ ছাড়া বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধিতে মিলার, আড়তদার, পাইকারদের পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ভূমিকা রয়েছে। এই অবস্থায় চালের আমদানি দ্রুত বাড়িয়ে বাজার স্থিতিশীলতার সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে খুচরা বাজারে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৯০-৯৫ টাকায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এই চালের দাম কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১২ টাকা। গত কয়েক বছরের মধ্যে মিনিকেট চালের দাম এখন সর্বোচ্চ। মিনিকেটের পাশাপাশি অন্যান্য চালের দামও বাড়তির দিকে রয়েছে। প্রতি কেজি মাঝারি মানের পাইজাম ও আঠাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ৬২-৬৪ টাকায়। এক মাসের ব্যবধানে এই চালের দাম বেড়েছে পাঁচ-ছয় টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৯-১০ টাকা। অন্যদিকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিতে দুই-তিন টাকা।
টিসিবির তথ্য মতে, বছর ব্যবধানে নাজির, মিনিকেট, মাঝারি মানের পাইজাম ও আঠাশ চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে মোটা চাল কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। এই চালের দাম বেড়েছে ৩ শতাংশ।
চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে ধানের মজুদ করেছেন। তাঁরা এখন বাজারে চাল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। আবার মিল গেটে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে অন্যায্যভাবে। বড় অটোরাইস মিলাররাও তাদের আধিপত্য ধরে রাখছে। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত আছে মাঝারি ও ছোট মিল মালিক এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। মিলার ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ও কারসাজিতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে চালের দাম।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চালের দাম সাম্প্রতিক সময়ে কমে আসার সম্ভাবনা কম। আমদানি পরিস্থিতি যেভাবে হওয়া দরকার ছিল, সেটি হচ্ছে না। আবার সরকারের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ নেই। যে মজুদ আছে সেটি দিয়ে খাদ্য ও দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা করলে সেই মজুদ কমে যাবে। আমন ও বোরোর মাঝামাঝি এই সময়ে এমনিতেই চালের দাম কিছুটা বেড়ে যায়। এবার উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় বাজারে বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্ত কম। বেসরকারিভাবে চাল আমদানিতে আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে।
চালের উচ্চমূল্য ঠেকাতে আমদানি দ্রুত বাড়াতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারিভাবে চাল আমদানি কম হলে সেটি সরকারিভাবেই পূরণ করতে হবে। সরকারের অভ্যন্তরীণ মজুদ বৃদ্ধি ২৫ লাখ টনে উন্নীত করতে হবে। খোলাবাজারে হস্তক্ষেপ ও গরিববান্ধব চাল বিতরণ কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য মজুদের পরিমাণ বাড়ানো দরকার। বিশ্ববাজারেও চালের দাম কমেছে। সরকারের এই সুযোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে আবার আগামী বোরো মৌসুমের শুরুতেই চাল আমদানি শেষ করতে হবে। তা না হলে কৃষকরা দাম পাবেন না। বোরোর ফলন ভালো হলে দাম কমে আসতে পারে।


